Home / Home Page / শীর্ষ জঙ্গিসহ মৃত ব্যক্তি শনাক্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সিআইডির ডিএনএ ব্যাংক

শীর্ষ জঙ্গিসহ মৃত ব্যক্তি শনাক্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সিআইডির ডিএনএ ব্যাংক

# ৬ হাজার মামলায় সার্ভারে সংরক্ষিত ২০ হাজার ডিএনএ প্রোফাইলিং
এসএম দেলোয়ার হোসেন
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিএনএ ল্যাবরেটরি নাম পরিবর্তন করে ডিএনএ ব্যাংক নামে কার্যক্রম শুরু করেছে। দেশের শীর্ষ জঙ্গিসহ অশনাক্তকৃত মৃত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে সিআইডির ডিএনএ ব্যাংক। গত ২৩ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই ল্যাবরেটরি ধর্ষণ, অজ্ঞাত মৃতদেহ শনাক্তকরন, পিতৃত্ব বিরোধ/নিষ্পত্তি, ডাকাতি, হত্যাসহ প্রায় ৬ হাজার মামলার বিপরীতে ১৬ সহস্রাধিক আলামত থেকে ২০ হাজার ডিএনএ প্রোফাইলিং করা হয়েছে। যা ‘ল্যাবরেটরি ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ এর সার্ভারে সংরক্ষিত রয়েছে। বিজ্ঞ আদালতের আদেশক্রমে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। ওই বছরের ১৫ জানুয়ারি ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি অফ বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম আলামত গ্রহণ করা হয়। ডিএমপির গণমাধ্যম শাখা সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিএমপির গণমাধ্যম শাখা জানায়, ডিএনএ ব্যাংকের কার্যক্রম হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সংরক্ষিত প্রতিটি ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল করা। ২০১৪ থেকে ২০২০ পর্যন্ত মোট সংগৃহীত মামলার সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। ডিএনএ ব্যাংকে সংরক্ষিত অপরাধীদের প্রোফাইল পরবর্তীতে ওই একই ব্যাক্তিকে শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন মামলার সাথে সম্পর্কিত প্রায় ১৫ হাজার প্রোফাইল ডিএনএ ব্যাংকে সংরক্ষিত রয়েছে। যার মাধ্যমে পরবর্তিতে খুব সহজেই সন্দেহজনক ব্যাক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব। ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষিত অপরাধীদের ডিএনএ প্রোফাইল তদন্তকার্যক্রমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফৌজদারি ও দেওয়ানী মামলা সংক্রান্ত সকল আলামতের বিশ্লেষণ ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবে হয়ে থাকে। অদ্যবধি ডিএনএ ল্যাব সিআইডির সহায়তায় বাংলাদেশ পুলিশ অসংখ্য ফৌজদারি ও দেওয়ানী মামলা সমাধান করতে সফল হয়েছে। ডিএমপি আরও জানায়, বর্তমানে ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাব দেশের বিভিন্ন কোর্ট, থানা হতে আগত শতাধিক মামলা গ্রহণ করে থাকে এবং নিদিষ্ট সময়ের মধ্যে রিপোর্ট প্রদান করে থাকে। ডিএনএ ডাটাবেজে সংরক্ষিত ডিএনএ প্রোফাইলসমূহ বিশ্লেষণ করে নিখোঁজ বা অজ্ঞাত কোন ব্যক্তিকে শনাক্তকরণ করা সম্ভব হয়, যদি অজ্ঞাত বা নিখোঁজ ব্যাক্তির দাবিদার কিংবা আত্মীয়-স্বজন পাওয়া যায়। ২০১১ সালের আগস্টে বাংলাদেশ পুলিশ কর্তৃক জাপান সরকারের জেডিসিএফ’র অর্থায়নে ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি অফ বাংলাদেশ পুলিশ শীর্ষক প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়ে তা সমাপ্ত হয় ২০১৫ সালের জুন মাসে।
ডিএনএ’র উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম ঃ (১) দেশের শীর্ষ জঙ্গী মুসাকে সনাক্তকরণ সম্ভব হয় ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে। ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল মৌলভীবাজার মডেল থানায় এ সংক্রান্তে একটি মামলা (মামলা নং-৩) রুজু হয়। ওই ঘটনায় ৩ জঙ্গির ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে তাৎক্ষণিক ২টি মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হলেও অপর ১টি সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট পরিচালিত জঙ্গি দমনের ওই ঘটনাটি অপারেশন ম্যাক্সিমাস নামে পরিচিত ছিল। ওই অপারেশনে জঙ্গি মুসার লাশ সনাক্তকরণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডিএনএ টেষ্টের প্রয়োজন হয়। মামলাটি পরবর্তীতে সিআইডিতে হস্তান্তর করা হলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিএনএ ল্যাবের সাথে যোগাযোগ করলে তাকে মৌলভীবাজার মডেল থানার মামলা নং-৩ মামলার অশনাক্তকৃত বাকি ১টি লাশের আলামত নিয়ে আসতে বলা হয়। উক্ত আলামত সিলেট মেডিকেল কলেজ থেকে নিয়ে আসলে সেই আলামতের ডিএনএ প্রোফাইল বাংলাদেশ পুলিশ, সিআইডির ডিএনএ ল্যাবে করা হয়। জঙ্গি মুসার মা সুফিয়া বেগমের কাছ থেকে সংগৃহীত নমুনা (রক্ত) পরীক্ষা করে মৌলভীবাজার মডেল থানার মামলা নং-৩ অসনাক্তকৃত বাকি ১টি লাশের আলামতের সাথে সাদৃশ্য পাওয়া যায়। ডিএনএ ক্রস-ম্যাচের মাধ্যমে জানা যায় উক্ত অশনাক্তকৃত ব্যক্তিই মুসা।
(২) ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ সীতাকুন্ড মডেল থানায় জঙ্গি সংক্রান্ত ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় (মামলা নং-৩০) ঘটনাস্থল থেকে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট কর্তৃক বিভিন্ন ধরনের জৈবিক আলামত সংগ্রহ করা হয়। এ সকল আলামতগুলো সত্যিকারার্থে কোন ব্যক্তির তা শনাক্ত করার জন্য ডিএনএ টেষ্টের প্রয়োজন হয়। এই মামলায় ডিএনএ পরীক্ষায় ৪ ব্যক্তির মৃতদেহের প্রোফাইলিং করা হয়। এই মামলার মৃতদেহের দাবিদার মো. ছায়েদুর রহমান যিনি একজন মৃত ব্যক্তির পিতা হিসেবে দাবি করেছিলেন। পরবর্তীতে মো. ছায়েদুর রহমানের নমুনা ডিএনএ প্রোফাইল করার পরে উক্ত ৪ ব্যক্তির প্রোফাইলের সাথে সাদৃশ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু ডিএনএ ব্যাংকে অনুসন্ধান করে অন্য একটি প্রোফাইলের সাথে সাদৃশ্য পাওয়া যায়। ওই মামলার অপর একজন দাবিদার মুনমুন আহম্মেদ যিনি উক্ত ৪ মৃত ব্যক্তির মধ্যে একজনের মাতা হিসেবে দাবি করেছিলেন। পরবর্তীতে মুনমুন আহম্মেদের নমুনা ডিএনএ প্রোফাইল করার পরে উক্ত ৪ ব্যক্তির প্রোফাইলের সাথে সাদৃশ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু ডিএনএ ব্যাংকে অনুসন্ধান করে অপর একটি মামলায় নিহত জঙ্গির জৈবিক মাতা হিসেবে প্রমাণিত হয়। দেশের গুরুত্বপূর্ণ মামলা তদন্তে এবং প্রতিনিয়ত আলামত সংগ্রহের পর ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে অসনাক্তকৃত ব্যক্তিদের সনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে সিআইডি পরিচালিত ডিএনএ ব্যাংক।