Home / জাতীয় / সিটি নির্বাচনে কম ভোট পড়ার নেপথ্যে

সিটি নির্বাচনে কম ভোট পড়ার নেপথ্যে

 

এসএম দেলোয়ার হোসেন
দেশের ইতিহাসে এবার ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কম ভোটারের উপস্থিতি অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। সাধারণ মানুষের কাছে নির্বাচন মানে উৎসব হলেও এবারের সিটি নির্বাচনে ভোট প্রদানে ভোটারদের মধ্যে একধরনের অনীহা দেখা দিয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়াসহ নানা কারনেই ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে কেন্দ্রেও যাননি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে, ভোটের প্রতি মানুষের অনীহা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। আওয়ামী লীগের এত জনসমর্থন থাকার পরও কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম থাকাটা ভাবনার বিষয়। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছে, দলীয় প্রার্থীরা নিজেদের বিজয় নিশ্চিত জেনে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের মূল্যায়ন না করায় ভোট প্রদানে কেন্দ্রবিমুখ ছিল ক্ষমতাসীন দলের মাঠপর্যায়ের ত্যাগী কর্মীরা। বিএনপি বলছে, ভোটারদের নিরাপত্তা না থাকায়, কেন্দ্র দখল, ইভিএমএ কারচুপির শঙ্কা আর সরকার সমর্থিত প্রার্থীর বাইরে বিরোধী প্রার্থীর এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেয়ায় কেন্দ্রবিমুখ ছিলেন সাধারণ ভোটাররা। নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এবারের সিটি নির্বাচনে এতো কম ভোটারের উপস্থিতি আগে আর কখনও দেখা যায়নি। তরুণদের মধ্যে ভোট প্রদানের ব্যাপারে বিরাট অনীহা। তারা মনে করে তাদের ভোটে ‘কি আসে যায়’। বিশ্লেষকেরা বলছেন, নানান কারনে ভোটার উপস্থিতি হ্রাস পাওয়ায় কম ভোট পড়েছে। সিইসি কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি কম হওয়ার নেপথ্যে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরাই দায়ী। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সব ধরণের প্রস্তুতিই নেওয়া ছিল। আজ বৃহস্পতিবার সাধারণ ভোটার, প্রার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ হয়েছে। এবারের সিটি নির্বাচনে দুই সিটিতে ভোটকেন্দ্র ছিল ২ হাজার ৪৬৮টি। ভোটকক্ষ ছিল ১৪ হাজার ৪৩৪টি। ঢাকা উত্তর সিটিতে ১ হাজার ৩১৮টি ভোটকেন্দ্র ও ৭ হাজার ৮৫৭টি ভোটকক্ষ এবং দক্ষিণ সিটিতে ১ হাজার ১৫০টি ভোটকেন্দ্র ও ৬ হাজার ৫৮৮টি ভোটকক্ষ ছিল। দুই সিটিতে ২৮ হাজার ৮৭৮টি ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হয়। ঢাকা উত্তরে ১৫ হাজার ৭০০টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ১৩ হাজার ১৭৮টি ইভিএম মেশিন ছিল। মোট ভোটার ছিলেন ৫৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬৭ জন। এবারের নির্বাচনে দুই সিটিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র প্রার্থীসহ ১৩ জন মেয়রপ্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ঢাকা উত্তর সিটিতে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ৩৩৪ জন। এরমধ্যে মেয়র পদে ৬ জন, ৫৪টি সাধারণ ওয়ার্ডের বিপরীতে ২৫১ জন কাউন্সিলর ও ১৮টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৭৭ জন নারী কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৭ জন মেয়র ৭৫টি ওয়ার্ডে ৩২৬ জন ও সংরক্ষিত ২৫টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ৮২ জন প্রার্থী লড়াই করেন।
ইসি সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকার দুই সিটিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় ঢাকা উত্তরে ৩৬টি ও দক্ষিণে ৫৭টি ওয়ার্ড ছিল। এবারের দুই সিটিতে ১৮টি করে মোট ৩৬টি ওয়ার্ড সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এতে বেড়েছে ভোটার ও কেন্দ্র সংখ্যাও। দুই সিটিতে মোট ভোটার ৫৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬৭ জন ভোটারের মধ্যে পুরুষ ২৮ লাখ ৪৩ হাজার ৮ জন ও নারী ভোটার ২৬ লাখ ২০ হাজার ৪৫৯ জন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটিতে মোট ভোটার ছিল ৩০ লাখ ১০ হাজার ২৭৩ জন। যার মধ্যে পুরুষ ১৫ লাখ ৪৯ হাজার ৫৬৭ জন ও নারী ১৪ লাখ ৬০ হাজার ৭০৬ জন। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটিতে ভোটার সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪ জন। যার মধ্যে পুরুষ ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৪৪১ জন ও নারী ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৩ জন।
অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্নের জন্য ইসি’র এতো প্রস্তুতির পরও এবারের নির্বাচনে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি সাড়া ফেলেনি। দেশের ইতিহাসে ভোট কম পড়ার নেপথ্যে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে ঢাকার দুই সিটির প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে।
সাধারণ ভোটাররা জানান, ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে যে চিত্র দেখা গেছে- তাতে এবারের ভোটপ্রদান নিয়েও সেই একই শঙ্কায় ছিলেন সাধারণ ভোটাররা। এছাড়া ভোটগ্রহণের আগেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্যান্য দল সমর্থিত প্রার্থীদের হামলা-হুমকিতে নিরাপত্তার কারণে অনেক ভোটারই এবার ভোট প্রদানে নিরুৎসাহিত ছিলেন। এছাড়া ভোটের তারিখ পরিবর্তন, ইসি’র নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় নির্বিঘ্নে ভোট প্রদানে অজানা শঙ্কা, ইভিএম ব্যবহার, টানা ছুটি থাকায় আর পরিবহন সংকটের ফলে ভোটার উপস্থিতি কম হতে পারে। এরপরও প্রথমবারের মতো ঢাকার দুই সিটিতে ইভিএম ব্যবহারে ভোটপ্রদান সহজ হয়েছে। এবার একটা ভালো নির্বাচন হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. সেলিম জানান, এবার ইভিএম’এ ভোটগ্রহণ হবে জেনে নিজ উদ্যোগে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে তিনি মধ্য রসুলপুরস্থ অ্যাড. কামরুল ইসলাম কমিউনিটি সেন্টারের তৃতীয় তলায় ভোটকেন্দ্রে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন, পুরো ফ্লোরে ৬-৭টি বুথ থাকলেও কোন ভোটার নেই। প্রতিটি বুথের সামনে লম্বা টুলে ক্ষমতাসীন দলের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রতীকী কার্ড ঝুলিয়ে বসে রয়েছেন। বুথের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা গল্প-গুজব করছেন। এরপর তিনি নির্ভয়ে ভোট প্রদানের জন্য সবকিছু ঠিক করে গোপন কক্ষে যান। সেখানেই ঘটে বিপত্তি। ক্ষমতাসীন দলের এজেন্টরা গোপন কক্ষে ঢুকে ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহারে সহযোগিতার কথা বলে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিয়ে তাকে চলে যেতে বলেন। নিরুপায় হয়ে তিনি বাসায় ফিরে যান। এবং পরিবারের অন্যান্যকে ভোট প্রদানে নিরুৎসাহিত করেন। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এভাবে ভোটহরণ করা হলে ভবিষ্যতে কেউ আর ভোটকেন্দ্রে যাবে না। এদিকে সুমন নামে ঢাকা দক্ষিণের সরকার সমর্থিত এক কাউন্সিলর প্রার্থীর ঘনিষ্ট ব্যক্তি ভোটের সপ্তাহখানেক আগেই সাধারণ ভোটারদের জানিয়ে দেন- এবারের ইভিএম হোক আর ব্যালটেই হোক, যেভাবেই ভোটগ্রহণ করা হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। সরকার সমর্থিত প্রার্থীকে কেউ ভোট দিলেও পাশ, আর না দিলেও পাশ করবে। এটা নিশ্চিত, তাই কষ্ট করে কারো ভোট দেওয়া লাগবে না। এরপর সরকার সমর্থক ভোটাররাও ভোটপ্রদানে নিরুৎসাহিত হন।
এক শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের বলেন, ভোট দেওয়ার তেমন কোন আগ্রহ পাইনি। তিনি বলেন, আমরা জানি- আমি ভোট দিলেও যে নির্বাচিত হবে, না দিলেও সে-ই নির্বাচিত হবে। এর কারণ হিসেবে ওই শিক্ষার্থী বলেন, ইসির তফসিল ঘোষণার পর থেকে আমরা এলাকার চারপাশে তেমনই শুনেছিলাম। আরেক শিক্ষার্থী বলেন, এবারের নির্বাচনে আমার প্রার্থী পছন্দ হয়নি। এছাড়া ভোটকেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বি কোন প্রার্থীর এজেন্টও ছিল না, তাছাড়া না-ভোটেরও ব্যবস্থা না থাকায় আমি ভোট দেইনি এমনকি ভোটকেন্দ্রেও যাইনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চাকরিজীবী এক ভোটার সাংবাদিকদের বলেন, আমি কেন্দ্রে গিয়েছিলাম, কিন্তু গিয়ে দেখি আমার সাথের জনের ভোট আগেই দেয়া হয়ে গেছে। তখন ওর সাথে আমিও ভোট না দিয়েই চলে আসি। অপর এক ভোটার বলেন, আমার বাসা মোহাম্মদপুর এলাকায়। কিন্তু আমি যাত্রাবাড়ীর ভোটার। রাস্তায় তো গাড়ি চলে নাই, আমি যে যাব, তারপর ফিরে আসব কীভাবে- তাই আমি ভোট দিতে যাইনি। দক্ষিণের ভোটার সাহিদ মিয়া, স্বপন, আলাউদ্দিন, মামুন, কালু ও নাসির ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদানের অভিজ্ঞতার আলোকে ইসি’র নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার ওপর এক ধরনের অনীহা তৈরি হওয়ায় ভোটারের উপস্থিতি কমে যায়। এ কারনেই এবার ঢাকার দুই সিটির প্রতিটি কেন্দ্রেই কম ভোট পড়েছে। তারা বলেন, ভোট দেয়া গণতান্ত্রিক অধিকার। অথচ ভোট দিতে গেলে ফিঙ্গার প্রিন্ট নেওয়ার পরই কতিপয় এজেন্টরা ‘ভোট দেওয়া হয়ে গেছে’ বলে গোপন বুথে প্রবেশের আগেই কেন্দ্র থেকে বের করে দেন। এতে সাধারণ ভোটাররা নিরাপত্তার স্বার্থে এমনকি পছন্দের কোন প্রার্থীকে ভোট দেওয়া হচ্ছে তা তাৎক্ষণিক ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় কেন্দ্রবিমুখ ছিলেন সাধারণ ভোটাররা। নির্বাচনী এমন প্রক্রিয়া ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত বলেও মন্তব্য করেছেন অনেক ভোটার।
৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী সাইদুর রহমান রতনসহ দুই সিটির একাধিক প্রার্থী জানান, ইসির তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত প্রার্থীদের হাতে বার বার হামলার শিকার হয়েছেন। নির্বাচন থেকে সরে যেতে নানাভাবে তাদের হুমকি-ধামকিও দেওয়া হয়। এসব বিষয়ে ইসিসহ রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এছাড়া প্রতিটি ভোটকেন্দ্র দখলে নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের নিযুক্ত এজেন্টরা প্রতিপক্ষ প্রার্থীর এজেন্টদের মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়। এতে নির্বাচনী পরিবেশ না থাকায় হামলা-হুমকি থেকে প্রাণ বাঁচাতে ভোটাররা ভোট প্রদান থেকে বিরত ছিলেন।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার জোট ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) প্রধান মুনিরা খান জানান, নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ২৫ বছরের অভিজ্ঞতায় অংশগ্রহণমূলক কোনো নির্বাচনে এবারের দুই সিটি নির্বাচনে এত কম ভোটারের উপস্থিতি তিনি এর আগে আর কখনও দেখেননি। তিনি বলেন, ঢাকা সিটি নির্বাচনে এত কম ভোটার উপস্থিতির নেপথ্যে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে মূল কারণ হলো তরুণদের মধ্যে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে বিরাট অনীহা। তারা মনে করেন তাদের ভোটে ‘কি আসে যায়’।
পর্যবেক্ষক মুনিরা খান বলেন, ঢাকার বাইরের স্থানীয় নির্বাচনেও ভোটারদের উপস্থিতি কমে এসেছে। এজন্য ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, ভোটকেন্দ্র থেকে বিরোধী এজেন্টদের বের করে দেয়া এবং সংঘর্ষের আশঙ্কা ইত্যাদি অনিয়মই দায়ী বলে মনে করেন ফেমার প্রধান মুনিরা খান। তিনি বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের অনাস্থার কারনে নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা অনেক কমে গেছে। এই আস্থা যদি বেশি থাকতো তাহলে আরও অনেক বেশি মানুষ ভোট দিতে যেত।
বিশ্লেষকরা জানান, ভোট দেওয়ার ব্যাপারে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর উল্টো চিত্র বাংলাদেশে। এ দেশের বেশিরভাগ মানুষ ভোট দিতে যান। ভোটের দিনটিকে একটি উৎসব হিসেবে দেখেন সাধারণ মানুষ। তারা জানান, স্বাধীনতার পর প্রথম দুই দশকে জাতীয় নির্বাচনগুলোতে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে। নব্বই পরবর্তী সময়ে সেই হার ৭৪ থেকে বেড়ে সাড়ে ৮৭ শতাংশ পর্যন্তও উঠেছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচন, যা বিরোধী দল বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট বর্জন করেছিল এবং সব দলের অংশগ্রহণে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই দু’টি নির্বাচন নিয়ে জনমনে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী দল বা প্রতিপক্ষ প্রার্থীরা বিগত বছরে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও ফল নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে। আর এসব কারণেও এবারের সিট নির্বাচনে অনেক ভোটার ভোট দিতে নিরুৎসাহিত হয়েছেন। মূলত অতীত অভিজ্ঞতার নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় এবারের নির্বাচনে ভোট কম পড়েছে বলে মনে করছেন নির্বচন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন চৌধুরী জানান, সিটি নির্বাচনে ভোটারদের ভোট প্রদানের আগ্রহ কমে যাওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। আমরা যেসব পদক্ষেপ নিয়েছি তার প্রভাব তো আছেই। যেমন- গাড়ি বন্ধ, টানা ছুটি থাকায় অনেকেই ঢাকা থেচে বেড়াতে যাওয়ায় কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি কমে যায়। অনেকে হয়তো চিন্তা করেছেন- সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফলে তাদের কী আসে-যায়। ভোট না পড়ার নেপথ্যে ভোটার উপস্থিতি কম থাকাসহ নানাবিধ কারণই কাজ করেছে বলে জানান ইসি’র এই কর্মকর্তা।
নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনে অস্বাভাবিক কম ভোট পড়া স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। এটা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত হতে পারে, কিন্তু এটাই বাস্তবচিত্র। জনগণ নির্বাচন বা ভোটের প্রতি নিরাসক্ত হলে নানা প্রকার ব্যাখ্যা বা অপব্যাখ্যা দিয়ে এই বাস্তব অবস্থার চিত্রটি খণ্ডন করা যাবে না। ভোটকেন্দ্রে বিরোধীপক্ষের দৃশ্যমান অনুপস্থিতি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই নির্বাচন প্রক্রিয়ার সংস্কার ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
ইসি সচিব মো. আলমগীর বলেন, অনাস্থার কারণে ভোটাররা কেন্দ্রে যাননি, এটা মনে হয়নি। অনাস্থার কারণে যদি ভোটে না যেতেন, তাহলে যারা সরকারি দল তাদের তো অন্তত ভোটে অনাস্থা নাই। তাদের যদি সব ভোটার ভোট দিতেন, তাহলেও তো এত কম ভোট পড়তো না। তার মানে হলো যারা সরকারকে সমর্থন করেন, তাদের অনেক ভোটারও ভোট দিতে যাননি। অনেকেই ছুটিতে থেকে ফেসবুকে ব্যস্ত ছিলেন।
সিইসি কে এম নূরুল হুদা জানান, এবারের সিটি নির্বাচনে কম ভোটারের উপস্থিতির জন্য রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরাই দায়ী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সাধারণ মানুষের কাছে নির্বাচন হচ্ছে উৎসবের মতো। তিনি জানান, ইসি’র সব প্রস্তুতি থাকার পরও ভোট কম পড়া আশানুরূপ ছিল না। এবার উত্তরে ভোট পড়েছে ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ। দক্ষিণে ৩০ শতাংশের মতো।
নির্বাচন পরবর্তী সচিবালয়ে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ভোটের প্রতি মানুষের অনীহা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। তিনি বলেন, ‘মূল্যায়ন করার জন্য আমরা ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং করছি। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে এলে এই মিটিং হবে। সেখানে নির্বাচন নিয়ে বীক্ষণ-পরিবীক্ষণ, আমাদের অরজারভেশন, পর্যবেক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করব। এ রকমই চিন্তা-ভাবনা রয়েছে।’
ওবায়দুল কাদের বলেন, এবারের নির্বাচনে ভোট কম পড়া ভাবনার বিষয়, আমাদের আওয়ামী লীগের এত জনসমর্থন, সেখানে আরও বেশি ভোট আশা করেছিলাম। আওয়ামী লীগের যে পার্সেন্টেজ সেই তুলনায় তো উপস্থিতি আশানুরূপ নয়। দুই-তিনদিন ছুটি থাকার কারণেও অনেকে চলে গেছেন। পরীক্ষার জন্য অনেকের বাচ্চা-কাচ্চা আছেন দেশে। হয়তো গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। পরিবহন সংকটও কিছুটা দায়ী। এরপরও আমি মনে করি একটা ভালো নির্বাচন হয়েছে।
তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, বিএনপি’র ইভিএম বিরোধী নেতিবাচক প্রচারণায় মানুষের মধ্যে সংশয় দেখা দেয়ায় এবারের নির্বাচনে ভোট কম পড়েছে। এমন প্রচারণায় নির্বাচনে ৮ থেকে ১০ শতাংশ ভোট কমেছে। এদিকে গত ৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির এমপি হারুন অর রশীদ বলেছেন, ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ভোটারদের অনুপস্থিতির কারণে নির্বাচন কমিশনকে দায় নিয়ে পদত্যাগ করা উচিৎ।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয়কারী এবং গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, নির্বাচনী পরিবেশ আর ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় জনগণের আস্থাহীনতার কারণে ভোটার উপস্থিতি খুবই কম হয়েছে। অনেক কেন্দ্র থেকে পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়ায় আগ্রহ হারিয়েছে সাধারণ ভোটাররা। যা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণের অন্তরায়।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ক্ষমতাসীন দলের অধীনে কখনোই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। এরপরও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে সিটি নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী দিয়েছিল। কিন্তু ইসি’র সেচ্ছাচারিতায় ইভিএম ব্যবহার, নির্বাচনী প্রচারণায় হামলা-হুমকি এবং কেন্দ্র থেকে বিএনপির পোলিং এজেন্টকে মারধর করে বের করে দেয়ায় কেন্দ্রবিমুখ ছিলেন সাধারণ ভোটাররা। নিরাপত্তার কারণেই অনেক ভোটার ভোট দিতে না যায় এবারের নির্বাচনে কম ভোট পড়েছে বলে জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল।
উল্লেখ্য, গত ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটিতে ভোটগ্রহণের জন্য ২৮ হাজার ৮৭৮টি ইভিএম ব্যবহার করা হয়। এরমধ্যে ঢাকা উত্তরে ১৫ হাজার ৭০০টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ১৩ হাজার ১৭৮টি ইভিএম মেশিন ছিল। ঢাকার দুই সিটিতে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ছিলেন ৪৫ হাজার ৭৭০ জন। এরমধ্যে ২ হাজার ৪৬৮ জন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, ১৪ হাজার ৪৪৫ জন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও ২৮ হাজার ৮৮০ জন পোলিং কর্মকর্তা। ঢাকা উত্তর সিটিতে ১ হাজার ৩১৮ জন প্রিজাইডিং, ৭ হাজার ৮৫৭ জন সহকারী প্রিজাইডিং ও ১৫ হাজার ৭১৪ জন পোলিং কর্মকর্তা ভোটগ্রহণের দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণে ১ হাজার ১৫০ জন প্রিজাইডিং, ৬ হাজার ৫৮৮ জন সহকারী প্রিজাইডিং ও ১৩ হাজার ১৭৬ জন পোলিং কর্মকর্তা ভোটগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন। ইসি সূত্র আরও জানায়, ভোটকেন্দ্রে ইভিএমের কারিগরি সহায়তা দিতে সশস্ত্র বাহিনীর ৫ হাজার ১৫ জন সদস্য মোতায়েন ছিল। এরমধ্যে ঢাকা উত্তরে ২ হাজার ৬৩৬ জন এবং দক্ষিণে ২ হাজার ৩০০ জন সেনা সদস্য ছিলেন। প্রতিটি কেন্দ্রে দু’জন করে সার্জেন্ট বা করপোরাল বা ল্যান্স করপোরাল অথবা সৈনিক দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ৫২ জন জেসিও ও ২৭ জন অফিসারও ভোটের দিন মাঠে ছিলেন। ইভিএম-এর কারিগরি সহযোগিতার জন্য উত্তরে ৩৮৪ জন এবং দক্ষিণে ৪৩৫ জন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে উত্তরে ৮২ জন ও দক্ষিণে ১৫৮ জন মোবাইল টিমের সদস্য হিসেবে ইভিএম-এর কারিগরি সহযোগিতায় নিয়োজিত ছিলেন। এছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভোটের দিন পাহারায় ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৫০ হাজার সদস্য। ঢাকা উত্তর সিটিতে ২৭ প্লাটুন বিজিবি, র‌্যাবের ৫৪টি টিম, পুলিশ ও এপিবিএনের সমন্বয়ে ৫৪টি মোবাইল ফোর্স, ১৮টি স্ট্রাইকিং ও ২৭টি রিজার্ভ স্ট্রাইকিং ফোর্স মাঠে ছিলেন। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৩৮ প্লাটুন বিজিবি, ৭৬টি র‌্যাবের টিম, পুলিশ ও এপিবিএন সমন্বয়ে ৭৫টি মোবাইল ও ২৫টি স্ট্রাইকিং ফোর্স মাঠে ছিলেন। দক্ষিণ সিটিতে পুলিশের ২৫টি রিজার্ভ স্ট্রাইকিং ফোর্সও ছিল। এছাড়া উত্তরে ৫৪ জন ও দক্ষিণে ৭৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিল যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা।

Loading...

Check Also

ভূমিহীন, গৃহহীনদের ঘর তৈরি করে দেবো : প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা প্রতিদিন.কম : গ্রামে গ্রামে গৃহহীনদের বিষয়ে খোঁজ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *