Home / জাতীয় / নানা সমস্যায় জর্জরিত নৌ-পুলিশ ইউনিট

নানা সমস্যায় জর্জরিত নৌ-পুলিশ ইউনিট

এসএম দেলোয়ার হোসেন
নদীমাতৃক বাংলাদেশে শুষ্ক-বর্ষা মৌসুমে ৪ থেকে ৬ হাজার কিলোমিটার নৌ-পথ রয়েছে। নানা সমস্যায় জর্জরিত রয়েছে দীর্ঘ এ নৌ-পথের নিরাপত্তায় গঠিত নৌ-পুলিশ ইউনিট। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বিশাল নদী পথের নিরাপত্তায় নিয়োজিত এ সংস্থাটি। দীর্ঘ ৬ বছরেও সংকট কাটেনি নৌ-পুলিশ ইউনিটের। সংস্থাটির নেই কোন নিজস্ব ভবন, উন্নত যানবাহন আর জলযান। অবকাঠামো আর জনবল সংকটে ভুগছে নদী পথের নিরাপত্তার প্রতীক এ সংস্থাটি। স্বল্প সংখ্যক জনবল দিয়েই চলছে নৌ-পথের অপরাধ দমনসহ নানা কার্যক্রম। নৌ-পুলিশ ইউনিটের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীমাতৃক এ দেশের ৬ হাজার কিলোমিটার নৌ-পথের নিরাপত্তা নিশ্চিতে শিগগিরই জনবল নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন আর লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়া দরকার। নতুবা স্বল্প সংখ্যক জনবল দিয়ে এ পথের অপরাধ নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন সমস্যা দ্রæত সমাধান করা সম্ভব হবে না। তবে এ সংকট নিরসনে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আজ নৌ-পুলিশ ইউনিট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, নদীমাতৃক বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কিলোমিটার এবং বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার নৌ-পথ রয়েছে। দীর্ঘ এ নৌ-পথে প্রায়ই ডাকাতিসহ নানা ধরনের অপরাধ ঘটতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দেশের দীর্ঘ এ নৌ-পথকে অপরাধমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে ২০১৩ সালের ১২ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় নৌ-পুলিশ ইউনিট। ২০১৪ সালে মাত্র ৭৩০ জন লোকবল নিয়ে নৌ-পুলিশ ইউনিটের শুরু হয়। একই বছরে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে এ সংস্থাটি। বর্তমানে দেশের দু’টি বিভাগের ৮টি অঞ্চলে নৌ-পুলিশের ১ হাজার ৯৩৪ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। বিভাগ দু’টির ১১টি জোনে মাত্র ১৪টি থানা ও ১০২টি ফাঁড়ি রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই নদীপথে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়ে আসছিলো। পুলিশ কৌশল নিয়েও তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারতো না। দিনের পর দিন জলদস্যুরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলো। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এবং পুলিশ ও র‌্যাবের কর্তাব্যক্তিরা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। অপরাধীদের কাছে নদী ও সাগরপাড়ের জেলেরা অনেকটা জিম্মি ছিলো। গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছে- দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৫২ নৌরুটে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য ছিলো। এসব নৌরুটে চাঁদাবাজি, ডাকাতি ও লুণ্ঠনের ঘটনা নিত্য-নৈমিত্তিক। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যাপক হারে ঘটছে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথগুলোতে পুলিশের টহল নেই বললেই চলে। দিনের চেয়ে রাতের বেলায় অপরাধ ঘটেছে বেশি। লঞ্চ ছাড়ার আগে যাত্রীদের কোনো ছবি ভিডিও সংরক্ষিত না থাকায় মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া, চাঁদপুরের ডাকাতিয়া, ষাটনল, নারায়ণগঞ্জের বন্দর, পাটুরিয়া ঘাট, মেঘনা নদী, মাওয়া ফেরিঘাট, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, ভোলা, খুলনা, বাগেরহাট, সুন্দরবনের হীরন পয়েন্ট, কচিখালী, কটকা, সুবতী, শ্যামনগর, খুলনার কয়রা, দাকোপ, বাগেরহাটের মংলা, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া, সুন্দরবন, বরগুনার পাথরঘাটা এলাকায় নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে লোকজন চলাফেরা করতো। এসব স্পটে অপরাধ নিয়ন্ত্রণসহ নৌ-পথের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতেই নৌ-পুলিশ ইউনিট গঠন ও কার্যক্রম শুরু করে। কোস্টগার্ডের সাথে সমন্বয় করেই স্বল্প সংখ্যক জনবল নিয়েই নৌ-পুলিশ নৌপথের নিরাপত্তায় কাজ করছে। সূত্র জানায়, উপকূলীয় এলাকায় নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে কোস্টগার্ড বড় ভূমিকা পালন করে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা বন্যায় কোস্টগার্ড উদ্ধারকর্মী হিসেবে কাজ করে। আবার অপরাধ, নৌ-ডাকাতি, মাদকপাচার, জাটকা নিধন, কারেন্ট জাল ব্যবহার, সার ও ডিজেল পাচার ইত্যাদিতেও কোস্টগার্ড ভূমিকা রাখে। নদী ও উপক‚লীয় এলাকাগুলোতে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সেখানে থানা পুলিশের একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় এর সীমানা নিয়ে। নদীর তীর ও পানি দিয়ে থানা এলাকার সীমানা চিহ্নিত হয় বলে মাঝেমধ্যেই দায়িত্ব পালন নিয়ে দুই থানার মধ্যে রশি টানাটানি হয়। আবার থানা এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয় বলে নদী এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সেভাবে সময় দিতে পারে না থানা পুলিশ। তবে ২০১৪ সাল থেকেই নৌ-পুলিশ ইউনিটের কার্যক্রম শুরুর পর বদলে গেছে নৌপথের অপরাধ চিত্র। সংশ্লিষ্টরা জানায়, নৌ পুলিশে রয়েছে- একজন ডিআইজি, দু’জন অতিরিক্ত ডিআইজি, ৫ জন পুলিশ সুপার, ১০ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ৫ জন সহকারী পুলিশ সুপার, ৩০ জন ইন্সপেক্টর, ৯০ জন সাব ইন্সপেক্টর, ১২০ জন এএসআই, ৯০ জন নায়েক, ৩৬০ জন কনস্টেবল, ১০টি ভেসেল, ১০টি পেট্রল বোট, ১৫টি ওয়াটার ট্রেইলার, ২ ডিট অ্যাম্বুলেন্স ও ১টি প্রিজন ভ্যান ও ৪টি স্পিডবোট।
নৌ-পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, দেশের বিভিন্ন পয়েন্টে চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল পুলিশ সদস্য নিয়ে নৌ-থানা ও ফাঁড়িতে দায়িত্ব পালন করছেন নৌ-পুলিশ সদস্যরা। ফাঁড়ির মাধ্যমে নৌপথের নিরাপত্তা দেয়া হয়। কিন্তু নৌ ফাঁড়িগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। বেশির ভাগ ফাঁড়িতে স্পিডবোট ও আগ্নেয়াস্ত্র নেই বললেই চলে। আবার কোনো কোনো স্থানে দু-একটি স্পিডবোট থাকলেও সেগুলো প্রায় সময়ই অকেজো হয়ে পড়ে। তারা জানান, নৌপথে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অবাধে বালু উত্তোলনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টহল দিতে হয় এই ইউনিটকে। এছাড়া চোরাচালান ও অপরাধ দমনে বিভিন্ন সময় বিশেষ অভিযানও পরিচালনা করতে হয়। কিন্তু এসব অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জলযান নেই এ সংস্থাটির। নেই কোন নিজস্ব ভবন। নৌ-পুলিশের কর্মকর্তারা আরও জানান, অনেক সীমাবদ্ধতার পরও নৌ-পুলিশ তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। জনবল ঘাটতি, নৌযান সংকট, পর্যাপ্ত নৌ-থানা ও নৌ-ফাঁড়ি না থাকায় তাৎক্ষণিক অপরাধ দমনে নৌ-পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিজস্ব কোনও অবকাঠামোও নেই এই ইউনিটে। তারা জানান, শুধু নদীপথে অপরাধ দমনই নয়, নিয়মিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নৌ-পুলিশের আরও কাজ রয়েছে। ঈদ, পুজা, প্রতিমা বিসর্জন, বিশ্ব ইজতেমা, নৌকাবাইচ, ওরসের মতো বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা দিতেও এই ইউনিটের সদস্যরা প্রতিনিয়তই দায়িত্ব পালন করছেন।
সাবেকর নৌ-মন্ত্রী শাহজাহান খান জানান, দেশের নৌ-পথকে অপরাধমুক্ত আর নিরাপদ রাখতেই ৭৩০ জন লোকবল নিয়ে নৌ-পুলিশ ইউনিট গঠন করা হয়। একজন যুগ্মসচিবকে প্রধান করে একটি কমিটিও গঠন করা হয়। চিহ্নিত করা হয় চাঁদাবাজি-ডাকাতির স্থানগুলো। দেশের ১৬টি জেলার অভ্যন্তরীণ নৌ-রুটের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে- সুনামগঞ্জ থেকে আশুগঞ্জ পর্যন্ত বৈদ্যের বাজার, ষাটনল, মোক্তারপুর, গজারিয়া, মেঘনাঘাট ও বসিলা। তিনি জানান, দেশের নদীপথে ত্রুটিমুক্ত নৌযান চলাচল নিশ্চিতকল্পে ভালভাবে পরিচালনা, কাল বৈশাখীর সময় সাবধানে নৌযান চলাচল এবং চাঁদাবাজি ও ডাকাতি ঠেকাতেই ২০১৩ সালের ১২ নভেম্বর নৌ-পুলিশ ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয়।নৌপথের নিরাপত্তায় নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ড সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছে।
নৌ-পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রেনিং, লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) ফরিদা পারভীন ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, দেশের নদীগুলোতে মা ইলিশ সংরক্ষণ এবং জাটকানিধন প্রতিরোধ অভিযানের মাধ্যমে নৌ-পুলিশ ইউনিট ইতোমধ্যেই সরকার তথা সাধারণ জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা ও জনবল সংকটের পরও নৌ-পুলিশ সততা ও নিষ্ঠার সাথে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, নৌ-পুলিশের নিজস্ব কোনও ভবন বা অবকাঠামো নেই। জনবলের চরম সংকট রয়েছে। নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় উন্নতমানের যানবাহন ও জলযান নেই। বর্তমানে দু’টি বিভাগ থেকেই প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথের নিরাপত্তার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বর্তমানে আরও নৌ-থানা ও ফাঁড়ির প্রয়োজন রয়েছে। ইতোমধ্যেই বেশকিছু নৌ-ফাঁড়ির অনুমোদন হয়ে গেছে। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে সেগুলো চালু করা যাচ্ছে না বলেও জানান নৌ-পুলিশের কর্মকর্তা ফরিদা পারভীন। আজ এ রিপোর্ট লেখাপর্যন্ত নৌ-পুলিশের প্রধান ডিআইজি আতিকুল ইসলামের সাথে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এসব ব্যাপারে তার কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, বর্তমানে পুলিশে কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭২৪ জন সদস্য। এর মধ্যে কর্মরত মহিলা পুলিশের সংখ্যা ১৩ হাজার ৩৯১ জন। আর কর্মরত পুরুষ পুলিশের সংখ্য ১ লাখ ৭৫ হাজার ৩৩৩ জন। বর্তমান সরকার কর্মক্ষেত্রে নারীর আরও অংশগ্রহণতে বৃদ্ধি করতে বদ্ধপরিকর। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, বাল্য বিবাহে প্রতিরোধ ও জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়নসহ উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যার ফলে ভবিষ্যতে পুলিশ নারী সদস্যসংখ্যা আরও বাড়বে। বর্তমানে সারাদেশে ৯৫ থানাকে মডেল থানায় উন্নীত করা হয়েছে। শুরু হওয়া নতুন বছরেই পুলিশ প্রশাসনের জনবল বৃদ্ধি, লজিস্টিক সাপোর্ট, অবকাঠামো উন্নয়ন, উন্নত প্রযুক্তির অত্যাধুনিক পুলিশ বাহিনী গঠনসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকে আরও শক্তিশালী করতে এবং প্রশিক্ষণসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পুলিশের সব ইউনিটেই পর্যায়ক্রমে জনবল নিয়োগ প্রদানসহ যে কোন ধরনের অপরাধ দমনসহ সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তরিকতার সাথে কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

Loading...

Check Also

ভূমিহীন, গৃহহীনদের ঘর তৈরি করে দেবো : প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা প্রতিদিন.কম : গ্রামে গ্রামে গৃহহীনদের বিষয়ে খোঁজ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *