Home / আইন আদালত / মা জেলে লেখাপড়া বন্ধ সন্তানের

মা জেলে লেখাপড়া বন্ধ সন্তানের

আদালত প্রতিবেদক
সুমাইয়ার অপলক দৃষ্টি। ভয়-আতঙ্কে জড়সড় তার ছোটভাই অবুঝ শিশু ওসমানেরও। শঙ্কিত মনে আদালতের বারান্দায় ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেও মায়ের দেখা পায়নি ওরা। অবশেষে মাকে খোঁজার আকুতি বিফলে গেল তাদের। অনেক মানুষের ভীড় ঠেলে মাকে দেখার স্বাদ শেষপর্যন্ত আর পূরণ হয়নি ওদের। মাকে না দেখে শিশু ওসমান বার বার বোন সুমাইয়ার কাছে জানতে চায়, মা কই? অসহায় শায়লারও নিরুত্তর। চোখে-মুখে বিষন্নতা। ছোট ভাইকে বুকে জড়িয়ে নেন শায়লা। মায়ের জন্য কান্না, আকুতি আর অপেক্ষার অবসান তো হলোই না, উল্টো ছোট ভাই-বোনদের কান্না থামাতে হিমশিম খেতে হয় বোন শায়লাকে। শায়লাও শিশু, বয়স মাত্র ১১। তার ছোট ভাই ওসমান, বয়স মাত্র ৫ আর ছোট বোন সুমাইয়ার যার বয়স ৭। ৩ ভাই-বোনের অসহায়ত্ব আদালতের পরিবেশকে মায়ার জালে আচ্ছন্ন করে তোলে। মায়া দিয়ে তো আর বিচার চলে না, সবকিছুর সমাধানও হয় না। বাস্তবতার নিষ্ঠুরতায় কখনো কখনো মানুষ হতভম্ব হয়ে পড়ে। তেমনি একটি ঘটনা সাক্ষী হয়ে রইল ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত চত্বর। মায়ের দেখা পেতে অবুঝ সন্তানদের মায়া কান্না দেখেছেন আদালতে আসা শত শত বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা। শিশুদের সান্তনা দেয়া ছাড়া আর কারো কিছুই করার ছিল না। মায়ের সাক্ষাত না পেয়ে একবুক হতাশা নিয়ে বাসায় ফিরে যায় ওরা। সম্প্রতি এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে আদালত চত্বরে।
স¤প্রতি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বারান্দায় দেখা মেলে ওই তিন শিশুর। মাকে দেখে না মাসের পর মাস। মায়ের আদর পেতে ব্যাকুল ওসমান ও সুমাইয়া। তাদের মা জেলে বন্দি ৯ মাসের বেশি সময় ধরে। মায়ের ছোঁয়া পেতে ও তাকে দেখতে আদালতে ছুটে আসে তারা। কিন্তু ভাগ্য তাদের সহায় হয়নি। এদিন তাদের মাকে আদালতে আনার খবরে ছুটে আসে। কিন্তু তাকে আনা হয়নি। মাকে না দেখে হাউ মাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে ওসমান ও সুমাইয়া। তাদের কান্না দেখে অনেক বিচারপ্রার্থীদের চোখের পানি টলমল করে। এসময় অনেকে তাদের সান্ত্ম্বনা দেন।
জানা যায়, মা যখন তাদের সঙ্গে ছিলেন তখন সুমাইয়া ও শায়লা স্কুলে যেত। আর ওসমান সারাক্ষণ মায়ের কাছেই থাকতো। মায়ের স্বপ্ন ছিল ওসমানকে নিয়েই। কখনো চোখের আড়াল হতে দিতেন না। ওসমান দুষ্টুমিও করতো বেশ। এখন তাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ। খাওয়া-দাওয়ারও ঠিক নেই। কোন রকমে নানা-নানীর কাছে মানবেতর দিন যাপন করছে। সুমাইয়া ও ওসমান সব সময় মায়ের জন্য কান্নাকাটি করে।
শিশু শায়লা বলেন, আমার আম্মু নির্দোষ। যেদিন আম্মুকে ধরে নিয়ে যায়, সেদিন আমার আম্মুর সাথে আমি ঘরের ভেতর বসা ছিলাম। ওইদিন আম্মুকে নাম ধরে একজন ডেকে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়। এরপর আম্মুকে বলে, তুই নাকি মাদক ব্যবসায়ী। তোর বাড়িতে মাদক আছে আমরা তোকে সার্চ করবো। সার্চ করার নাম করে আম্মুকে ওরা ধরে নিয়ে গেল। গত ৮ মাস ধরে মা জেলে রয়েছে। আম্মুর বান্ধবী কাকলি, আঁখি, ও আঁখি খালার স্বামী আসলাম আমার আম্মুকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। আম্মুকে যখন মহিলা পুলিশ তল্লাশি করে তখন আমি নিজের চোখে দেখেছি তারা একটা চটের ব্যাগের মধ্যে তিন বোতল মদ রাখছিলো। এরপর ওই মদ আম্মু রেখেছে বলে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলো।
পরিবারের এখন কী অবস্থা সেই বিষয়ে শায়লা বলেন, আমার একটা বড় ভাই আছে। নাম শাকিল। আম্মু কারাগারে যাওয়ার পর থেকে আমার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আর পড়িনা। আমরা ৪ ভাই-বোন এখন কেউই পড়ালেখা করতে পারছি না। বড়ভাই শাকিল প্রসঙ্গে শায়লা বলেন, ভাইয়ের হাতে সমস্যা রয়েছে। সে ঠিকমত কাজ করতে পারেনা। নানা-নানী কোনভাবে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। মাঝে মধ্যে আম্মুর কথা খুব মনে পড়ে। যখন মনে পড়ে তখন খুব কান্না পায়। এছাড়াও আমার ছোট দুই ভাইবোন আম্মুর কাছে যাবে, আম্মু কই বলে কান্না করে। আজ ৮ মাসের বেশি হল আম্মুর কাছে যেতে পারিনি। ছোট ভাই- বোনদের কোন কিছু বলে বুঝানো যাচ্ছে না। মাঝে মধ্যে নানা-নানী ওদের বুঝাতে হিমশিম খাচ্ছেন। শায়লা বলেন, আমরা তিন ভাই-বোন আম্মুকে দেখতে আদালতে গিয়েছিলাম। আদালতে যাওয়ার পর শুনছি তাকে নাকি আনা হবে না। তাই আম্মুকে না দেখেই আবার ফিরে যেতে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ২১ মার্চ পুলিশ খবর পায় ভাসানটেক থানাধীন ১ নং বস্তির মজুমদারের মোড় সংলগ্ন আসামি বেগমের বসত ঘরের সামনে গলি রাস্তার ওপর নেশাজাতীয় দ্রব্য বিক্রয় করছে। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে বেগমের কাছ থেকে সাদা পলিথিনে রক্ষিত ১শ’ গ্রাম নেশাজাতীয় মাদকদ্রব্য কথিত লুজ হেরোইন এবং তার মা জোলেখা বেগমের কাছে থাকা প্ল্যাস্টিকের ব্যাগ থেকে ২১ বোতল নেশাজাতীয় মাদকদ্রব্য চোলাই বাংলা মদ পাওয়া যায়। যার মূল্য ১ লাখ ৭ হাজার ৮শ’ টাকা। এ ঘটনায় ওইদিনই ভাসানটেক থানার এসআই রুহুল আমিন হাওলাদার মা-মেয়ের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। বর্তমানে জোলেখা বেগম জামিনে আছেন। মামলাটি তদন্ত করে ভাসানটেক থানার সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) রবিউল আউয়াল ৩০ এপ্রিল আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। মামলাটি এখন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

Loading...

Check Also

অসংখ্য দেশীয় অস্ত্রসহ মানিক ডাকাত গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা প্রতিদিন.কম : চট্টগ্রাম মহানগরীর দুর্ধর্ষ ডাকাত ১০ মামলার আসামি মানিক ডাকাতকে গ্রেপ্তার ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *