Breaking News
Home / জাতীয় / ইন্টারনেটের অপব্যবহারে পর্নোআসক্তিতে বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়-অপরাধ

ইন্টারনেটের অপব্যবহারে পর্নোআসক্তিতে বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়-অপরাধ

 

এসএম দেলোয়ার হোসেন
বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে ডিজিটালের এ যুগে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। প্রযুক্তির কল্যাণে বাংলাদেশের জনগণও পিছিয়ে নেই। যোগাযোগের অন্যতম প্লাটফর্ম হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে একে অপরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন। পারিবারিক আলাপসহ ব্যবসায়ীক কার্যক্রমও সারছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এমন সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই স্বল্প সময়ে দখল করছে পর্নো বা অশ্লীল ভিডিওতে। এতে অতি উৎসাহী হয়ে সমাজের সব বয়সের মানুষই পর্নো সাইটে ঝুঁকে পড়ছে। জরুরি প্রয়োজনীয় কাজ বা লেখাপড়ার চেয়ে এসবে মগ্ন হয়ে পড়ছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীরা। দেশে প্রায় ৯ কোটি ইন্টারনেট গ্রাহক ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, ইমো বা হোয়াটস অ্যাপে সহজেই পেয়ে যাচ্ছে যে কোন ভিডিও। অনেকে পাড়া-মহল্লার কম্পিউটার দোকান থেকে মেমোরি কার্ডে লোড করে এমনকি ইউটিউবের মাধ্যমে দেখছেন সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত জামালপুর জেলা প্রশাসকের (ডিসি) অপকর্মের ভিডিও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির কল্যাণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো জনগণের যে সেবা প্রদান করছে, তেমনি এর অপব্যবহারও বাড়ছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পর্ণো সাইট বা অশ্লীল ভিডিওতে সয়লাব হওয়ায় তা দেখে সব বয়সের অনেকেই অনুপ্রানিত হয়ে পড়ছে। বাড়ছে পারিবারিক ও সামাজিক কলহ কোন্দল। এতে ক্রমেই বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়সহ নানা ধরণের অপরাধ প্রবণতা। এসব প্রতিরোধে আইন থাকলেও তা যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। ১৮ বছরের নিচে কারো হাতে স্মার্ট ফোন দেয়া ঠিক নয়। কোমলমতি শিশু-কিশোরদের মোবাইল ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে হবে। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে অধিকাংশ নারী-পুরুষ খারাপ দিক বেছে নিচ্ছে। এমন চিন্তাধারা নিয়েই বেড়ে উঠে নিজ পরিবার তথা সমাজের মধ্যেই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছে তারা। এসব রোধে অভিভাবকদের আরো সচেতন হতে হবে। বিটিআরটি বলছে, ইতোমধ্যেই দেশে প্রায় ২২ হাজার পর্নো সাইট বন্ধ করা হলেও তা পুরোপুরি সম্ভব নয়। পুলিশ বলছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ সরকার বা রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচার করছে কি না সেদিকে বিশেষ নজরদারি চলছে। এছাড়া কেউ হয়রানির শিকার হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। গতকাল বুধবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার চালু হলেও ১৯৯৫ সালে অফলাইন ই-মেইল-এর মাধ্যমে প্রথম এদেশে সীমিত আকারে ইন্টারনেটের ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৯৬ সালের ৬ জুন দেশে প্রথম ইন্টারনেটের জন্য ভিস্যাট স্থাপন করা হয় এবং আই.এস.এন নামক একটি আই.এস.পি’র মাধ্যমে অনলাইন ইন্টারনেট সংযোগের বিস্তৃতি ঘটতে শুরু করে। ১৯৯৯ সালে রাজধানীর বনানীতে সাইবার ক্যাফে চালু হয়। ফলে এই আই.এস.পি গুলি ছিল কেবলমাত্র বি.টি.টি.বি-ই সরকারি মালিকানাধীন। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের উদারনৈতিক নীতি এবং ইন্টারনেট প্রযুক্তির দ্রæত বিস্তারের কল্যাণে ২০০৫ সাল নাগাদ ১৫০ এর অধিক আই.এস.পির নিবন্ধন দেয়া হয়েছে এবং বর্তমানে সরকারের টেলিযোগাযোগ আইনের আওতায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এই আই.এস.পি সমুহ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করছে। ২০০৪ সালে বাংলাদেশে ফেসবুক চালু হয়। আর ইউটিউব চালু হয় ২০০৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশ সরকার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিখাতকে আরো কার্যকর করতে নানামূখী উদ্যোগ গ্রহণ করে। ডিজিটালের এ যুগে ঘরে বসেই যে কেউ যেন এর সেবা গ্রহণ করতে পারে, সেদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর প্রতিনিয়ত কাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে ডিজিটালের এ যুগে বাংলাদেশে বেড়েছে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার। বর্তমানে নারী-শিশুসহ ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪ কোটি ছাড়িয়েছে। ২০২১ সালে এর সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। সূত্র জানায়, ডিজিটালের এ যুগে ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দেশের শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সব বয়সের মানুষ এখন স্মার্ট ফোন ব্যবহার করছে। সেই ফোনের মাধ্যমে অনায়াসে পেয়ে যাচ্ছে অশ্লীল-আপত্তিকর অসংখ্যা ভিডিও। এতে করে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষই অশ্লীল বা পর্নোতে আসক্ত হয়ে উঠছেন। বাড়ছে অপহরণ-ধর্ষণ-খুনের মতো ভয়াবহ ঘটনা। সূত্র আরো জানায়, একসঙ্গে বন্ধু-বান্ধব মিলে বা বাসায় নিজের ঘরে নিরিবিলি পর্নো দেখছে কিশোর-কিশোরী তরুণ-যুবকরা। প্রায় প্রত্যেকের হাতেই রয়েছে স্মার্টফোন-কম্পিউটার-ল্যাপটপ। স্বল্প খরচে ইন্টারনেটও পাচ্ছে তারা। হাজার হাজার পর্নোসাইটে প্রতি মিনিটে আপলোড হচ্ছে পর্নোগ্রাফি। শুধু ভিডিও পর্নোগ্রাফি নয়, অডিও পর্নোগ্রাফিও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তাদের কাছে। কানে হেডফোন দিয়ে শুনতে পারছে রগরগে বয়ান। এ অবস্থায় কিশোর ও যুবকরা বেড়ে উঠছে বিকৃত মানসিকতা নিয়ে। যার প্রভাব পড়ছে সমাজে। বাড়ছে ইভটিজিং ও ধর্ষণের মতো ঘটনা।
রাজধানীর বেশকিছু শিক্ষার্থী জানায়, তারা তাদের বন্ধুদের কাছ থেকেই প্রথম পর্নো দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে । তাদের অনেকেই স্মার্টফোন ব্যবহার করার সময় পর্নোসাইটের বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখে জীবনে প্রথম পর্নো দেখে। আবার কেউ ইউটিউবে বিদেশি ছবির বিভিন্ন নগ্নদৃশ্য দেখে পর্নোসাইটে প্রবেশ করতে শুরু করে। এভাবেই তারা অশ্লীল ভিডিওগুলো ডাউনলোড করে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করছে।
বেসরকারি সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, মোবাইল ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশই এর মাধ্যমে পর্নো দেখে। অনেক সময় এতে আসক্ত হয়ে নিজেরাই নিজেদের নুড ছবি বা ভিডিও ধারণ করে বন্ধুদের সঙ্গে বিনিময় করে। এরপর কখনো বন্ধুত্বের ফাটল ধরলে এ ভিডিও বা ছবিগুলো ইন্টারটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এতে বলা হয়েছে, অনলাইনে পর্নোগ্রাফি অবাধ হওয়ায় স্কুলের গন্ডি পেরোনোর আগেই শিক্ষার্থীরা ভয়াবহ এ নেশায় আক্রান্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে দেড় হাজারেরও বেশি শিক্ষকের ওপর জরিপ চালানো হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের এমন আচরণ সম্পর্কে জানেন দুই-তৃতীয়াংশ বা শতকরা প্রায় ৬২ ভাগ শিক্ষক। তারা জানান, অনলাইন থেকে যৌনতায় আসক্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতি ছয়জনের একজন হলো প্রাথমিক স্কুলপড়–য়া বয়সী। যেসব শিক্ষার্থী মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, তাদের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষকরা। তারা জানান, মোবাইল ফোন ব্যবহার করে এসব শিক্ষার্থী নিজেদের নগ্ন ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে দিচ্ছে। যেসব শিক্ষার্থী নরম মনের, শান্তশিষ্ট তাদের এসব ছবি পাঠিয়ে নানাভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে, তাদের যৌন হয়রানি করার জন্য এসএমএস দিচ্ছে। ক্লাসের পড়া চলাকালীনও কিছু শিক্ষার্থী মোবাইল ফোন ব্যবহার করে যৌন কর্মকান্ত চালায় বলে জানান শিক্ষকরা। এদিকে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পর্নোগ্রাফি দেখার কারণে কিশোররা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না। যৌন সহিংসতার প্রতি আকৃষ্ট হয়, অশ্লীলতার চর্চা বেড়ে যায়। রাজধানীতে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭৭ ভাগ কোনো না কোনোভাবে পর্নোগ্রাফি দেখছে। ২০০৯ সালে শিশুদের পর্নো আগ্রহ নিয়ে ফাউন্ডেশনটি সর্বশেষ গবেষণা চালালেও এরপর আর এ বিষয়ে গ্রহণযোগ্য কোনো গবেষণা বা পরিসংখ্যান তৈরি করেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাহিয়া মাহি, সালমান মুক্তাদির, জেসিয়া ইসলাম, জয়া আহসানসহ দেশি-বিদেশি অনেক নামিদামি তারকার অশ্লীল ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তারা। সম্প্রতি জামালপুরের ডিসি’র ভিডিওটি শহর ছাপিয়ে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় সর্বত্র তীব্র আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ওই পর্নোটি ইতোমধ্যেই ছোটবড় সবার মোবাইলসহ ইউটিউব ও পর্নোসাইটে ছড়িয়ে পড়েছে। এরপর আরো কয়েকটি ভিডিও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সবাই খুব সহজে যে কোনো মুহুর্তে চাইলে একটি পর্নো হাতের কাছেই পেয়ে যাচ্ছে। ইন্টারনেট মানুষের জীবনকে সহজ করে দিলেও এর অপব্যবহার সমাজকে ভাঙ্গনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে গড়ে উঠছে অসুস্থ প্রজন্ম। জামালপুর জেলা প্রশাসকের এমন ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি জানান, এই মুহুর্তে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে জামালপুরের ডিসি। সরকার ইতোমধ্যেই দেশে ২২ হাজার পর্নোসাইট বন্ধ করলেও এই ভিডিও এখনো সরকার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বাংলাদেশে পর্নোগ্রাফি আইন-২০১২ রয়েছে। এই কাজে লিপ্ত ব্যক্তির সাত বছরের জেল ও ২ লাখ টাকা জরিমানার বিধান আছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ তে ১ কোটি টাকা জরিমানা ও ১৪ বছরের জেলের বিধান থাকলেও জেলা প্রশাসক ও তার সহকর্মীকে এ আইনের আওতায় না আনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, সেই সঙ্গে যারা এই অশ্লীল ভিডিও প্রসার ও প্রচার ঘটিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে একই শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীরা জানান, বাংলাদেশে নানা কারণে যৌনতা সম্পর্কিত ব্যাপারগুলোকে ট্যাবু হিসেবে দেখা হয়। শিশুরা সঠিক যৌন শিক্ষা না পাওয়ায় তারা যৌনতাকে নিষিদ্ধ হিসেবে জানলেও নিষিদ্ধ পর্নোর দিকে ঝুঁকে পড়ে। এসব শিশু যখন আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে তখন তারা আর ওই জায়গা থেকে বের হতে পারছে না। ফলে বিকৃত যৌন শিক্ষার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এসব শিক্ষার্থীর পরিবার ও রাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। পর্নো দেখলে মস্তিষ্কের একটা ফিল গুড রাসায়নিক তৈরি হয়। এর নাম ডোপামিন। একটানা পর্নো দেখলে মস্তিষ্কে ডোপামিনের পরিমাণ বেড়ে যায়। তখন সামান্য ডোপামিনের ক্ষরণে উত্তেজনা তৈরি হয় না। আরো বেশি ডোপামিনের জন্য মস্তিষ্কের আরো বেশি পর্নোর রসদ খোঁজে এবং আসক্তি বাড়িয়ে তোলে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতার পাশাপাশি সরকারকে আরো কঠোর হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
ঢাবি’র সহকারী অধ্যাপক ও সমাজ এবং অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক জানান, আগেও কিশোর ও যুবকদের পর্নো ছবির প্রতি আসক্ত ছিল, এখনো আছে। আগে ব্যয়বহুল হলেও এখন অনেক সহজলভ্য হওয়ায় আসক্তির সংখ্যাটা বাড়ছে। তিনি বলেন, আসক্তদের কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, পরিবারের সদস্যরা এ ব্যাপারে জানতে পারলেও লোকলজ্জায় তাদের সন্তানদের কাউন্সেলিংয়ে দেয় না, সেটা একটি বড় সমস্যা। তিনি আরো বলেন, আসক্ত কিশোর বা যুবক একা থাকার চেষ্টা করবে। কাউকে দেখলে মোবাইল লুকিয়ে ফেলবে। স্বাস্থ্যহানি হবে। এসব বিষয়গুলো যদি পরিবারের কোনো কনিষ্ঠ সদস্যদের মধ্যে দেখা যায়- তাহলে বুঝতে হবে সে পর্নো আসক্তিতে ভুগছে।
বিএসএমএমইউ’র মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. ঝুনু শামসুন নাহার জানান, স্কুলের শিক্ষক এবং মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই পারে পর্নো আসক্তি থেকে তাদের বের করে আনতে। এই আসক্তি থেকে সন্তানদের বের না করতে পারলে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঢেকে যাবে। তিনি জানান, মোবাইলে আসক্ত শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ হচ্ছে অন্যভাবে। তাদের চিন্তাজুড়ে থাকছে ফেসবুক, ইমু, ভাইভার, স্কাইপের আবেগ অথবা গেমসের নানা চরিত্র। ব্লু -হোয়েল গেমসটি এর অন্যতম উদাহরণ। এজন্য প্রতিটি মা-বাবার উচিত শিশুদের প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে না দিয়ে পর্যাপ্ত দেখাশোনা করা, তাদের সঙ্গে সময় কাটানো, গঠনশীল আলোচনা করা।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, ইদানীং ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে মোবাইল ফোনের নেশা বেশি তৈরি হয়েছে। এর অপব্যবহার ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে। এ কারণে ছাত্ররা ইভটিজিং, বখাটেপনাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। পড়াশোনা বাদ দিয়ে তারা পাড়া-মহল্লায় চুকিয়ে আড্ডা দিচ্ছে, দলাদলি করছে, গভীর রাতে ফোনালাপে ব্যস্ত থাকছে। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে তিনি অভিভাবকদের অনুরোধ জানান। ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়ায় ছাত্র-ছাত্রীরা লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়ে পড়ছে বলে জানান শিক্ষাবিদ ড. জাফর ইকবাল।
সেভ দ্য চিলড্রেন’র চাইল্ড প্রটেকশন অ্যান্ড চাইল্ড রাইটস গর্ভনেন্সের ডিরেক্টর আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, বিকল্প কোনো সুযোগ না থাকায় পর্নো দেখার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে সব বয়সের মানুষের মাঝে। তারা যখন মোবাইল ফোনে বিভিন্ন সাইটে প্রবেশ করে ঠিক তখনই বিভিন্ন পর্নোসাইটের বিজ্ঞাপন সামনে আসে। যার কারণে অনেক সময় এসব দেখেও পর্নোসাইটগুলোতে তারা প্রবেশ করছে। গতবছর পর্নোগ্রাফিক সব ধরনের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসিকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এমন নির্দেশ দেয়ার পরও পর্নোসাইটগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীরা জানান, বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশ। তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে দেশের আরো উন্নতি হবে, দিন দিন নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন হবে। এক্ষেত্রে সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে এখন থেকেই মা-বাবা অর্থাৎ অভিভাবকদের সাবধান হতে হবে।
১৮ বছর বয়সের আগে ছেলে মেয়েরা কোন ভাবেই যাতে মোবাইল ফোন বা স্মার্টফোন হাতে না পায়, সেদিকে অভিভাবকদেরই খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়া সন্তানরা যা চাইবে তা-ই দেয়া যাবে না, সন্তনাদের চাহিদার ভালো-মন্দের বিভিন্ন দিক অভিভাবকদেরই ভাবতে হবে। আরো অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। অনেক সময় মা-বাবার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ও অসচেতনতার কারণে সম্ভাবনাময় সন্তানরাও বিপথগামী হওয়ায় বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয় ও অপরাধ।
পুলিশের সাইবার অপরাধ বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নাজমুল ইসলাম জানান, কেউ যাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় কারো বিরুদ্ধে অপপ্রচার এমনকি রাষ্ট্র বা সরকারবিরোধী প্রপাগাণ্ডা ছড়াতে না পারে সেদিকে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। সম্প্রতি অভিনেত্রী সাদিয়া জাহান প্রভা, জামালপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীর, তার অফিস সহকারী সানজিদা ইয়াসমিন সাধনা, মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ জেসিয়া ইসলামসহ আরো কয়েকজন অভিনেত্রীর আপত্তিরক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তারা। এসব বিষয়ে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি অনলাইনে অশ্লীল ভিডিও প্রকাশ করার ঘটনায় গত ১৬ এপ্রিল নিউমার্কেট এলাকা থেকে অশ্লীল ভিডিওকারী মো. তরিকুল ইসলাম বাদশাহ @ বাদশা ট্যাট্যুকে গ্রেফতার করে ডিএমপি’র সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ দমন বিভাগ। এসময় ভুক্তভোগী এক নারীর ভিডিওসহ মোবাইল ফোন ও তার ফেইসবুক আইডি ও পেইজ জব্দ করা হয়।
ডিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় জানান, সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ যদি সংক্ষুব্ধ হয়ে তাদের কাছে অভিযোগ করেন, তাহলে তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারেন। এছাড়া কেউ যদি সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী কোনো ভিডিও কনটেন্ট দিয়ে নিরাপত্তা বিঘু ঘটানোর চেষ্টা করে তখন পদক্ষেপ নেয়া হয়। অপরদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কেউ জিডি বা মামলা করলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব বলে জানান পুলিশের শীর্ষ এ কর্মকর্তা।

Loading...

Check Also

স্থাপনা থেকে স্বাধীনতাবিরোধীদের নাম মুছে ফেলার নির্দেশ হাইকোর্টের

নিজস্ব প্রতিবেদক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালসহ সব স্থাপনা ও সড়ক থেকে স্বাধীনতাবিরোধীদের নাম মুছে স্থানীয় ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *