Home / জাতীয় / সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা

সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা

এসএম দেলোয়ার হোসেন
মিয়ানমার সরকারের অসহযোগিতা আর কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল ও এনজিও সংস্থার অপতৎপরতায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ক্রমেই বিলম্বিত হচ্ছে। দিন যত গড়াচ্ছে, পাহাড়ি বন উজার করে ততোই উগ্র হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। এতে হুমকির মুখে পড়ছে স্থানীয় পরিবেশ ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো। ইতোমধ্যেই রোহিঙ্গারা মাদক-মানবপাচারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ স্থানীয়দের ওপর সশস্র হামলা ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ত করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। ফলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর এমন কর্মকাণ্ডে প্রতিনিয়ত গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করছেন স্থানীয়রা। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার সুযোগে নানা কৌশলে দিনে-রাতে শরণার্থী শিবির ছেড়ে অবাধে পালিয়ে রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় নানা ধরণের অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। পাহাড়ি বন উজার করে রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাফেরায় একদিকে যেমন পরিবেশ ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি স্থানীয়দের মাঝে ভীতি কাজ করছে। বিশাল এ জনগোষ্ঠীর শিবিরগুলো ঘিরে চারপাশে নিরাপত্তা প্রাচীর না থাকায় নানা কৌশলে শিবির ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় পালিয়ে যাচ্ছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কাও রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, গত প্রায় দু’বছরে শরণার্থী শিবির ছেড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার রোহিঙ্গাকে আটক করে শিবিরগুলোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বিশাল এলাকাজুড়ে সীমানা প্রাচীর না থাকায় রোহিঙ্গাদের পালানো ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য অনেকটাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গাদের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থা। নজরদারিতে রয়েছে ক্যাম্পে দায়িত্বরত স্থানীয় প্রশাসন ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ এনজিও সংস্থা এমনকি কতিপয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া কাজ দেয়ার নামে নিজ দেশে রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে নিরুৎসাহিত করাসহ বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত থাকায় ৪১টি এনজিও’র কার্যক্রম প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাকিগুলোর কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আজ রোববার রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয়সহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, দু’বছর আগে মিয়ানমারের মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে পরিচিত আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) নামের বিদ্রোহীরা রাখাইন রাজ্যের ৩০টি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পে একযোগে হামলা চালায়। এতে ১২ নিরাপত্তাকর্মী ও ৮০ বিদ্রোহী নিহত হয়। পরদিন ২৬ আগস্ট আরসার বিদ্রোহী ও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই জাতিগত নিধনে মিয়ানমারের মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক জান্তা আর মগদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, অমানুষিক শারিরিক-মানসিক নির্যাতনের মুখে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর নারী-শিশুসহ লাখ লাখ মানুষ স্থল-নৌপথ পাড়ি দিয়ে শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় গড়ে তোলা ৩৪টি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয় তারা। এরপর আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশ সরকারের উদার মনোভাব ও মাদবতার পরিচয় দেয়ার প্রশংসায় ভাসিয়ে মিয়ানমার সরকারকে দায়ী করে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের তাগিদ দেয়। কিন্তু মিয়ানমার সরকার নানা টালবাহানায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে শুরু করে। সময়ের ব্যবধানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত রোহিঙ্গারা বিভিন্ন এনজিও সংস্থার সহায়তায় বিনা বাধায়ই স্থানীয় প্রশাসনের সামনেই একের পর বন উজার করে আবাসন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গারা মাদক-মানবপাচারসহ নানা অপরাধে জড়াতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গারা স্থানীয়দের জন্য এখন বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে। এদিকে শরণার্থী শিবিরগুলোতে বিভিন্ন ধরণের সহায়তা প্রদানের নামে কর্মরত কতিপয় এনজিও সংস্থা আর কুচক্রী মহলের অপতৎপরতায় আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অনেকেই নানা কৌশলে শিবির ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় পালাতে শুরু করেছে। এদের অনেকেই বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করে বিদেশে পাড়িও দিয়েছেন। অনেকেই বিদেশে পালাতে গিয়ে বিমানবন্দরে ধরাও পড়েছেন। উন্নত জীবন-যাপনের আশায় দিনের পর দিন রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে বাইরে পালিয়ে গিয়ে ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস ও কাজকর্ম করছেন। এতে রোহিঙ্গাদের পদভারে স্থানীয়রা সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়ায় একদিকে যেমন স্থানীয় পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও ধ্বংসের মুখে পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সরকারের কয়েকদফার চেষ্টায় আন্তর্জাতিক মহলের চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও দু’দফায়ও সেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বশেষ গত ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এক মুহিবুল্লার ইশারায় ও এনজিও সংস্থার অপতৎপরতায় তা বাধাগ্রস্থ হয়। মিয়ানমার সরকারের ওপর ৫টি শর্ত জুড়ে দিয়ে রোহিঙ্গারা এখন আর তাদের নিজ মাতৃভূমিতে ফিরতে রাজি হচ্ছে না। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় স্বাধীনভাবে চলাফেরাকারী রোহিঙ্গারা উন্নত জীবন-জীবিকার আশায় নানা কৌশলে দিনরাত ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে পালাতে শুরু করেছে। এতে অজানা আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা জানান, ১৯৯২ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রাতারাতি একটি সংগঠনের নেতা বনে যাওয়া বিদেশি সমন্বয়কারীর নেতা মহিবুল্লার নির্দেশেই এখন উঠবস করছে আশ্রিত রোহিঙ্গাসহ সরকারের স্থানীয় রোহিঙ্গা প্রশাসন। এনজিওরা যখন যা চাইছে সেটাই হচ্ছে। তারা প্রত্যাবাসনবিরোধী কাজ করলেও কিছুই বলতে পারছে না বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসন। এনজিওরা রোহিঙ্গাদের জন্য কাজের কথা বলে ইচ্ছামতো পাহাড় কাটলেও সেখানে চুপ করে থাকছেন সরকারি কর্মকর্তারা। ক্যাম্পে বিভিন্নভাবে সরাসরি অর্থ বিতরণের মতো কাজ অনিয়মতান্ত্রিক হলেও তার অনুমোদন পাচ্ছে আরআরআরসি থেকে। কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের এনজিওগুলোতে চাকরি দেয়ার কোনো সুযোগ না থাকলেও কয়েক হাজার রোহিঙ্গা এখন চাকরি করছেন এনজিওগুলোয়। এমনকি বাংলাদেশিদের বাদ দিয়ে সেখানে রোহিঙ্গা নিয়োগের মতো সিদ্ধান্তও অবলীলায় নিচ্ছে এনজিওগুলো। এছাড়া শরণার্থী শিবির ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্য খুলে বসেছে রোহিঙ্গারা। কৌশলে এসব নিয়োগ ও ব্যবসার জন্য অনুমতি নেয়া হচ্ছে সরকারি প্রশাসন থেকেই। ক্যাম্পগুলোয় রোহিঙ্গারা প্রকাশ্যে ত্রাণ বিক্রির ব্যবসায় নামলেও তা দমনে কোনো উদ্যোগ নেই সরকারি প্রশাসনের। গত ২২ আগস্ট টেকনাফে যুবলীগ নেতা ওমর ফারুক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের দিকে রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততার আশঙ্কা ফের দানা বেঁধেছে। যে ওমর ফারুক দু’বছর আগে পালিয়ে আসা শতশত রোহিঙ্গা পরিবারকে আশ্রয় ও তাদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছিলেন, সেই রোহিঙ্গাদের হাতেই দু’বছর পর নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হলো যুবলীগ নেতা ওমর ফারুককে। রোহিঙ্গাদের এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে স্থানীয় জনমনে প্রচণ্ড ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজ করছে।
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, মহানুভবতা দেখাতে গিয়ে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় সেই রোহিঙ্গারাই স্থানীয়দের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি ও এনজিও কর্মকর্তারা অর্থের লোভে পড়ে বেশি মাত্রায় রোহিঙ্গাবান্ধব হয়ে গেছেন। শিবিরের দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তারা আশ্রয় শিবিরের ভেতর হাটবাজার বসিয়ে কয়েক হাজার দোকানপাট, জুয়েলারি থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করছেন। এসবের কিছুই সরকারি তহবিলে জমা হয় না। এতেই রোহিঙ্গারা নিজ দেশে না ফেরার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। সুযোগ বুঝেই নানা ধরণের অপরাধে জড়াচ্ছেন এমনকি শিবির ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন।
কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আয়াছুর রহমান ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, ১১ লাখ ১৮ হাজার ৯৫১ জন রোহিঙ্গার ৩৪টি আশ্রয় শিবির ঘিরে কাঁটাতারের বেড়া নেই। শিবিরের আয়তন প্রায় ১০ হাজার একর। অরক্ষিত শিবিরগুলোর চারদিকে ১ হাজারের বেশি জঙ্গলঘেরা দুর্গম পথ রয়েছে। মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে গড়িমসি করায় তারা ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে। ফলে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে বলেও জানান কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলনের এই নেতা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির বলেন, আশ্রয় নেয়ার পর থেকেই রোহিঙ্গারা এখানে অশান্ত পরিবেশ তৈরি করছে। খুনের মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হচ্ছে। দিনের পর দিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে জনসংখ্যা বাড়ছে। নিজদেশে ফেরত না গেলে সমস্যা আরো প্রকট হবে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারকে রাজি করাতে জাতিসংঘ চাপপ্রয়োগ করতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্র্রদায়কে এখন দায়িত্ব নিয়ে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে উদ্যোগী হতে হবে বলেও জানান সাবেক এই রাষ্ট্রদূত। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, বাংলাদেশের ভেতরে রোহিঙ্গাদের ঠেলে দিতে তারা (মিয়ানমার সেনাবাহিনী) তাদের লোক দিয়ে এ হামলা করিয়েছে কিনা, সেটা চিন্তা করতে হবে। তিনি বলেন, নির্যাতনের মুখে অসংখ্য রোহিঙ্গা শিশু কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। যাদের সামনে তাদের বাবা-মাকে হত্যা এবং বোনকে ধর্ষণ করা হয়েছে। শিবিরে বেড়ে ওঠা আশ্রিত ওই শিশুরা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে। যদি এমন হয়- তাহলে শুধু মিয়ানমারই নয়, আশ্রয়দাতা দেশের জন্যও নেতিবাচক হতে পারে। তাই ওইসব শিশুর প্রতিও বিশেষ নজর দিতে হবে।
বিশ্লেষকরা জানান, এনজিও কর্মকর্তা হিসেবে কিছু কিছু দেশের গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট ছদ্মবেশে শিবির এলাকা ঘুরে বেড়াচ্ছেন, যাদের উদ্দেশ্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নয়। তাদের উদ্দেশ্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা দিয়ে গোলযোগ তৈরি করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ফায়দা লুটা। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে তাদের শিকড় গাড়া। এক্ষেত্রে ওইসব এনজিও কর্মীগুলোর পেছনে খুব ভালভাবেই নজর দেয়া উচিত। আর ওই এনজিওদের কার্যক্রম আরো সীমাবদ্ধ করে দেয়া উচিত। তারা যা সাহায্য করতে চায়, তা বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে জমা দিক। ওইসব কর্মকর্তাদের সরাসরি রোহিঙ্গাদের কাছে যাওয়া সীমিত করা হোক। রোহিঙ্গা ক্যাম্পজুড়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক জ্যাম করে দেয়া হোক, যেন কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না পারে। যেসব কোম্পানির সিম রোহিঙ্গাদের হাতে ওইসব কোম্পানিগুলোকে জরিমানা করাসহ লাইসেন্স বাতিলের মতো শাস্তি প্রদান করা প্রয়োজন বলে জানান বিশ্লেষকরা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে তৎপর রয়েছে প্রত্যাবাসন বিরোধী চক্র। তাদের কাছে সাধারণ রোহিঙ্গারা অনেকটাই জিম্মি। তিনি জানান, শরণার্থী শিবিরগুলো থেকে দেশি-বিদেশি সব এনজিওকে তুলে দেয়া উচিত। কিছু কিছু এনজিও নিজেদের পকেট ভারী আর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নানাভাবে প্রত্যাবাসনে বাধা দিচ্ছে। তবে কূটনৈতিক প্রয়াস অব্যাহত রেখে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে হবে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন-জাপান ও ভারতের বর্তমান অবস্থানকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বাংলাদেশের কূটনৈতিক দেনদরবারের কারণে প্রথমবারের মতো চীন এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত নিরাপত্তাসহ আরো নানা ইস্যুতে মিয়ানমার ও চীন একে অপরের ওপর অনেক নির্ভরশীল। যদিও চীনা প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কথা দিয়েছেন রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশের পাশে থাকবে চীন। এছাড়া সদ্য ঢাকা সফরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশ, ভারত এবং মিয়ানমারের জন্যও ঝুঁকির কারণ হবে বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন। এটি বাংলাদশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কারণ রোহিঙ্গা সংকট এখন একটি বৈশ্বিক ইস্যু।
এ ব্যাপারে ঢাবি’র আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন জানান, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নয়, পুরো অঞ্চলের সমস্যা। ভূ-রাজনীতিতে মারাত্মক অস্ত্র হয়ে উঠবে রোহিঙ্গারা। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ ও মাদকের নয়া টার্গেটে পরিণত হবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি হয়ে ওঠতে পারে এই আশ্রিতরাই এমন আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। এই সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেই এগিয়ে আসতে হবে। নতুবা এর সমাধান হবে না। তিনি বলেন, দু’বার ব্যর্থ হয়েছে বলেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থামিয়ে রাখা যাবে না। বরং কোন কারণে ব্যর্থ হয়েছে, সেসব কারণ চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। রোহিঙ্গাদের আস্থার সংকট দূর করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ কমিশন গঠন করে পরিবেশ-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রত্যবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন। সামনেই জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন। সেখানে জোরালভাবে বিষয়টি তুলে ধরা উচিত। সেইসঙ্গে প্রতিটি রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়-বহুপক্ষীয় ক‚টনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে বলেও জানান ড. দেলোয়ার হোসেন।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে তারা বদ্ধপরিকর। এর বিকল্প কোনো উপায় নেই। প্রত্যাবাসনের শর্তপূরণ করা মিয়ানমারের দায়িত্ব। টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য তারা শিগগিরই নতুন কোনো পন্থা চিন্তা করছেন।
এদিকে গত শনিবার সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর ১৩৯টি এনজিও কক্সবাজার এলাকায় কার্যক্রম শুরু করেছিল। এর মধ্যে ৪১টি এনজিও অপকর্মে লিপ্ত থাকায় তাদের সব ধরনের কার্যক্রম প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখনো বিভিন্ন এনজিও একই কাজ করছে, বলে তথ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এদের ওপর নজরদারি চলছে। প্রমান পেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও নানা ভাবে তদবির করছে বলেও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, কক্সবাজারের ৩৪টি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়ার পর থেকেই রোহিঙ্গারা নানা কৌশলে পালিয়ে যাচ্ছে। গত ২০ মাসে শিবির থেকে পালানো ৫৮ হাজার ৫৮৩ রোহিঙ্গাকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করে ক্যাম্পে ফেরত পাঠিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা ক্যাম্পের চারপাশে সীমানা প্রাচীর বা কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় রোহিঙ্গাদের পালানো ঠেকানো এমনকি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। গত কয়েকদিনে বিভিন্ন উপায়ে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে কক্সবাজার আসার পর পুলিশের হাতে আটক হয় ৩৪ রোহিঙ্গা। এদের মধ্যে নারী-পুরুষ ও শিশু রয়েছে। উন্নত জীবন-জীবিকার আশ্বাসে প্রত্যাবাসনে অনাগ্রহ প্রকাশ করে দিনে কিংবা রাতে অবাধে ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা। পুলিশ-র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, রোহিঙ্গাদের পালানো ঠেকাতে কক্সবাজারের বিভিন্ন সড়কে ১১টির বেশি তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে। সন্দেহভাজন পথচারী-যাত্রী ও যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এরপরও আশ্রয় শিবির ছেড়ে রোহিঙ্গাদের পালানোর ঘটনায় উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা।
কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন জানান, বিশাল এলাকা জুড়ে তাদের অবস্থান হওয়ায় রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা স্থানীয় প্রশাসনের জন্য অনেকটাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। তবে স্থানীয়দের নিরাপত্তা, পরিবেশ-আর্থ সামাজিক ও প্রত্যাবাসনসহ সব বিষয়কে সামনে রেখেই রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে তৎপর রয়েছে পুলিশ।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন জানান, রোহিঙ্গা শিবিরে অপতৎপরতা ঠেকাতে ইতোমধ্যেই এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর নির্দেশে মুক্তি কক্সবাজারসহ আরো ৪১টি এনজিও’র কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশাল এ জনগোষ্ঠীর পালানো ঠেকাতে ও অপরাধ দমনে কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন।

Loading...

Check Also

ভোলায় ট্রলারডুবি: এখনো নিখোঁজ ১৩ জেলে

নিজস্ব প্রতিবেদক ভোলায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে মেঘনা নদীতে ট্রলার ডুবির ঘটনায় ২৪ জেলের মধ্যে এখনো ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *