Breaking News
Home / অর্থ-বাণিজ্য / প্রস্তাবিত বাজেট ২০১৯-২০: বিনিয়োগে অপার সম্ভাবনা পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই

প্রস্তাবিত বাজেট ২০১৯-২০: বিনিয়োগে অপার সম্ভাবনা পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই

অর্থনীতি ডেস্ক, ঢাকা প্রতিদিন.কম ১৬ জুন : দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু তা কাজে লাগাতে কার্যকর উদ্যোগ নেই। ফলে দৃশ্যত বাড়ছে না বিনিয়োগ, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এটি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য।

এ অবস্থায় শিল্পোদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশা ছিল, এবারের বাজেটে বিনিয়োগের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে। এমন কিছু বিষয় রাখা হবে, যাতে সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এজন্য বাজেট ঘোষণার পর সংশ্লিষ্টরা হতাশ হয়েছেন। নির্ঘাত এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, গত কয়েক বছর পর্যন্ত ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। এটি সবাই স্বীকার করছেন। তিনি মনে করেন, ঘোষিত বাজেটের কারণে আগামী অর্থবছরেও বিনিয়োগ বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ হল, বেসরকারি বিনিয়োগে অর্থায়নের দুটি প্রধান উৎস ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা নেই। ব্যাংকগুলোতে পুঁজি স্বল্পতা প্রবল। খেলাপি ঋণও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আরও একটি সমস্যা হল, সুদের হার মোটেই বিনিয়োগ সহনীয় নয়। এতে করে এক কথায় বলতে পারি, বহুমুখী সংকটে ব্যাংক ও শেয়ারবাজার। এর ফলে বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত জোগান নিয়ে শঙ্কা আরও বাড়বে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রথমে পুঁজির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ চাহিদা অনুযায়ী ভালো উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে। এক্ষেত্রে সিঙ্গেল ডিজিট তো বটেই, সবচেয়ে ভালো হবে শিল্প ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশের মধ্যে বেঁধে ফেলতে হবে। এজন্য সরকারি উদ্যোগে ঋণ বিতরণের জন্য বড় অংকের বিশেষ তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। এছাড়া গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। কেননা, উৎপাদন ব্যাহত হলে অর্থের জোগান সহজ করে লাভ হবে না। শিল্প গড়ে তুলতে হলে যেহেতু জমির বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাই এ বিষয়ে সরকারের পুরো প্রশাসন যন্ত্রকে সেবার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদ্দাকথা শিল্পোন্নয়ন যেহেতু দেশ এগিয়ে যাওয়ার প্রধান নিয়ামক; তাই এ বিষয়ে বাজেটে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা থাকা জরুরি।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, অর্থনীতিতে একটি স্বাভাবিক হিসাব রয়েছে, যা হল ইনক্রিমেন্টার ক্যাপিটাল আউটপুট রেশিও। সহজে বললে, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য কত শতাংশ বিনিয়োগ করতে হয়, তার হিসাব। গত কয়েক বছরের হিসাবে দেখা গেছে, ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য জিডিপির ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ বিনিয়োগ করতে হয়। এ হিসাবে বর্তমানে জিডিপির আকার প্রায় ২৯ লাখ কোটি টাকা। আর প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ২ শতাংশ। ফলে এ হারে প্রবৃদ্ধির জন্য প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। মির্জ্জা আজিজ বলেন, এ চিন্তা মাথায় রেখেই অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হবে না। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। তার মতে, বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা দূর করতে হবে। বিশেষ করে পুঁজির জোগানসহ সহজে ব্যবসা করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

জানা গেছে, বিনিয়োগের জন্য অন্যতম উপাদান হল পুঁজি। আর এই পুঁজির দুটি খাত হল, ব্যাংক ও শেয়ারবাজার। বর্তমানে ব্যাংকে চরম বিশৃঙ্খলা চলছে। কয়েকটি ব্যাংকে তারল্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থায় প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার কথা বলছে সরকার। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগে ব্যাংক থেকে পুঁজির জোগান দেয়া খুবই কঠিন হবে। অন্যদিকে চরম আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার তলানিতে। এ কারণে বাজেট থেকে সহায়তা দিয়ে পুঁজিবাজার টেনে তোলা হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগে পুঁজি সংগ্রহের সক্ষমতা এই বাজারের নেই। অর্থনীতিবিদদের বিবেচনায় এটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ।

উদ্যোক্তারা বলেছেন, শিল্পে বিনিয়োগের জন্য ঋণের জোগান বাড়াতে হবে। কিন্তু ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত তারল্য নেই। ফলে তারা বড় বড় শিল্প প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারছেন না। এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কম সুদে ঋণের জোগান দিতে কোনো বিশেষ তহবিলও গঠন করা হয়নি। ফলে ঋণ সংকটের কারণে উদ্যোক্তারাও নিজেদের পুঁজি নিয়ে বিনিয়োগে নামতে পারছেন না।

সূত্র জানায়, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো বড় শিল্প স্থাপন করতে গেলে মোট বিনিয়োগের ৩০ শতাংশ জোগান দেন উদ্যোক্তারা। বাকি ৭০ শতাংশই জোগান দিয়ে থাকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। শিল্প দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দেয়া হয় বলে এগুলোর সুদের হারও থাকে কম। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। যে কারণে তারা বড় শিল্পে চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান দিতে পারছে না। একই সঙ্গে তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো এখন চড়া সুদে আমানত নিয়ে ঋণ দিচ্ছে। যে কারণে সুদের হারও বেশি। ফলে শিল্প খাতের জন্য চাহিদা অনুযায়ী কম সুদে বিনিয়োগ মিলছে না। এই সংকট কাটাতে উদ্যোক্তারা শিল্প খাতের জন্য কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জোগান দিতে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের দাবি জানিয়েছিলেন। সেটি প্রস্তাবিত বাজেটে করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রফতানিকারক সমিতির সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কমাতে হবে করের ভার। কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে হবে। জমিপ্রাপ্তির সংকট দূর করতে হবে। এসব ব্যাপারে বাজেটে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারের বাজেটে কর্পোরেট করের হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। উদ্যোক্তারা মনে করেন, বিশ্বের যে কোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে করের হার বেশি। এ কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।

এবারের বাজেটে রফতানিমুখী শিল্পে একদিকে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে, অন্যদিকে করের বোঝা বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে রফতানি খাতে রফতানি আয়ের ওপর আগে দশমিক ২৫ শতাংশ উৎসে কর আরোপিত ছিল। এবারের বাজেটে সেটি বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। এ খাতে কর বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ। রফতানির বিপরীতে যে বিকল্প নগদ সহায়তা দেয়া হয় তার বিপরীতে উৎসে কর ছিল ৩ শতাংশ, প্রস্তাবিত বাজেটে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১০ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে কর বেড়েছে ৭ শতাংশ। ভ্যাটের জালও বাড়ানো হয়েছে। এসব কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে।

বিনিয়োগ বাড়াতে হলে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। শিল্প স্থাপন করেও গ্যাসের সংযোগ মিলছে না। বাধ্য হয়ে যারা নিজ খরচে লাইন নির্মাণ করছেন তাদের ওপর নানা রকম খড়গ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এসব কারণে উদ্যোক্তা কারখানা চালুর আগেই লোকসানের মুখে পড়ছেন। এজন্য সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ হতাশার শেষ নেই।

এছাড়া বিনিয়োগের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে পর্যাপ্ত জমি পাওয়া। কেউ আবার জমি কিনে শিল্প গড়ে তুলতে চাইলেও নানা অজুহাতে পদে পদে বাগড়া দেয়া হয়। এ ব্যাপারেও বাজেটে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি। উল্টো জমি বেচাকেনার ওপর করের হার বাড়ানোর পাশাপাশি টিআইএন নাম্বার জমা দেয়ার বিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। স্বল্প আয়ের যেসব মানুষ জমি বেচাকেনা করেন তাদের অনেকেরই টিআইএন নেই। এতেও নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি হবে।

ঢাকা প্রতিদিন.কম/এআর

Loading...

Check Also

সেবাসংক্রান্ত তথ্যপ্রাপ্তি ও মতামত প্রদানে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমের সম্ভাবনা

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক, ঢাকা প্রতিদিন.কম : আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় সেবা সম্পর্কে সঠিক এবং বিস্তারিত তথ্য ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *