Home / জাতীয় / পর্যটনের সম্ভাবনা থমকে

পর্যটনের সম্ভাবনা থমকে

ডেস্ক রিপোর্ট:-

তিস্তা সড়ক সেতু উদ্বোধনের পর থেকেই প্রতিদিনই এই সেতুটিকে দেখতে ছুটে আসছেন আশপাশ এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ। একটি নতুন সেতুর পাশে পুরোনো রেলওয়ে সেতু মাঝ দিয়ে বয়ে চলা মরা তিস্তার বিভিন্ন সময়ের খেয়ালি ভাব উপভোগ করতে আসা মানুষ একটু জিরিয়ে সময় নিয়ে দেখতে চান। বিশেষ করে সন্ধাবেলা এখানে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য অনেক বেশি উপভোগ্য হয়ে উঠে। দুই ঈদ, পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন পার্বণে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে টইটম্বুর থাকে তিস্তার বেলাভূমি। পর্যটনের সম্ভাবনা থমকে আছে। দাবি উঠে সেতুটিকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার। কিন্তু দীর্ঘ ৯ বছরেও এখানে পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার কোনো উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। সময়ের ব্যবধানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু মানুষ স্পীড বোর্ড ও নৌকার ব্যবস্থা করেছেন। দর্শনার্থীরা সেগুলোতে উঠে দুই সেতুর মাঝ দিয়ে তিস্তার পানির আনন্দ উপভোগ করেন। কিন্তু এখানে কোনো শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। এতে নারী ও শিশু দর্শনার্থীরা সময় নিয়ে থাকতে পারেন না। শিশুদের বিনোদনের জন্য কোনো রাইড স্থাপন করা হয়নি। ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান বসে খোলা আকাশের নিচে। প্রচণ্ড রোদে এখানে কোনো জায়গা নেই বসার। শুক্রবার মাগরিবের নামাজের ২০ মিনিট আগে দেখা গেছে পুরোনো সেতুর বিভিন্ন গার্ডার এবং সেতুর ভিতরেও পাটাতনের ওপর মানুষে মানুষে ঠাসা। কিন্তু সেটি ঝুঁকিপূর্ণ। দর্শনার্থীরা এ কথা জানেন না। তাদের এ কথা জানিয়ে দেয়ার কোন লোকও পাওয়া যায়নি সেখানে। এছাড়া পুরো মার্জিনাল ডাইক বাঁধ জুড়ে এলেমেলোভাবে মোটরসাইকেল এবং ভ্রাম্যমাণ দোকানী বসার কারণে দর্শনার্থীরা ভালোভাবে হাঁটাচলা করতে পারছেন না। সেটা দেখারও কেউ নেই। উপরন্তু ওই মার্জিনাল ডাইক বাঁধের ওপরেই কিছু আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যকে দেখা গেছে বেঞ্চ নিয়ে বসে থাকতে। স্পীড বোর্ড ও নৌকায় একবার ঘুরে আসার জন্য ২০ টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও অনেক মাঝি লোক বুঝে বেশি টাকা নিচ্ছেন। সেসব দেখার কোনো লোক নেই সেখানে।

লালমনিরহাট-কুড়িগ্রামের প্রবেশ মুখে রংপুরের তিস্তা সড়ক সেতুর খোলা হাওয়ায় জমে উঠেছে ঈদের বাঁধভাঙ্গা আনন্দের ঢেউ। পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে নির্মল আনন্দ নিতে সব বয়সী মানুষ ভিড় করেছেন মরা তিস্তা পাড়ের এই সেতুতে। কিন্তু এখানে দীর্ঘ ৯ বছরেও গড়ে উঠেনি পার্ক, ছাউনি, শৌচাগারসহ দর্শনার্থীদের জন্য কোনো সুবিধা। ফলে এই সেতুটিকে ঘিরে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ পর্যটন এবং সড়ক ও জনপদ কর্তৃপক্ষ।

সড়ক ও জনপদ বিভাগ সূত্র জানায়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সড়ক ও জনপদ বিভাগ সেতু- ৩ প্রকল্পের আওতায় ৭৫০ মিটার দীর্ঘ ও ১২ দশমিক ১ মিটার প্রস্থের তিস্তা সড়ক সেতু ও ২ দশমিক ২৯২ কিলোমিটার এপ্রোচ সড়ক ও  ৭৫০ মিটার ব্যাঙ্ক প্রটেকশনের এই সেতুর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৮৭ কোটি ৬ লাখ ৪ হাজার ৩৬ টাকা। কিন্তু ৫ দফায় সময় বৃদ্ধির কারণে প্রকল্প ব্যয় ৩৪ কোটি ৯৭ লাখ ৯৫ হাজার ৯৩৬ টাকা বৃদ্ধি হয়ে দাঁড়ায় ১২২ কোটি ৪ লাখ টাকায়। আমিন-ডেলিম-আসকো জেভি নামের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতুটি নির্মাণ করে। আর এর দেখভালের দায়িত্ব পালন করেন বিসিএল-টায়েফ-ইস্টুপ জেভি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সেতুটি খুলে দেয়া হলে এই অঞ্চলে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হয়। পুরোনো রেলওয়ে সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচল অব্যাহত থাকে।

নাছির নামের এক মাঝির নৌকায় উঠেছিলেন রনজিত দাস ও তার ২ সহকর্মী। একবার ঘুরে আসার পর তাদের কাছ থেকে নেয়া হয় ১৫০ টাকা। ঈদের বকশিশ হিসেবে নেয়া হয় ২০ টাকা। কিন্তু একইভাবে ঘুরে আসা আরেক নৌকাওয়ালা জনপ্রতি নেন ২০ টাকা করে। বিষয়টি নিয়ে নাছিরের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি জানান, এখানে যার কাছে যেমন পাই, সে রকম নেই। অপরিচিত লোকদের কাছে একটু বেশি নেই। নাছির জানালো শুক্রবার বিকেল পৌন ৬টা পর্যন্ত তার আয় হয়েছে ৭ হাজার ৫৪০ টাকা। পুরোনো সেতুর পাশে দর্শনার্থী জান্নাতুল ফেরদৌসী জাকিয়া জানালেন, এতো সুন্দর একটা ঘোরার জায়গা। কিন্তু কোন টয়লেট নেই। শিশুদের জন্য রাইড নেই। সন্ধার পর এখানে থাকা যায় না। বাজে ছেলেদের আনাগোনা বেড়ে যায়। নতুন সেতুর ওপর কথা হয় নাজমুল আলম নামের একজন সরকারি কর্মকর্তার সাথে। তিনি জানান, সেতুটিকে ঘিরে পর্যটন কর্তৃপক্ষের অনেকর আগেই পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা উচিত ছিল। কিন্তু কেন তা করা হচ্ছে বিষয়টি আমার বোধগম্য নয়। এভাবে সম্ভাবনাকে নষ্ট করা ঠিক নয়।

ঘুরতে আসা ডাইক বাঁধে শিশু সন্তানকে নিয়ে বসে থাকা আমেনা ইসলাম জানালেন, এখানে সব জিনিসের দাম বেশি। কিন্তু মান খারাপ। শিশুরা একটা খেলনা পছন্দ করলে দোকানদাররা ইচ্ছেমত দাম হাকান। উপায় না থাকায় অভিভাবকরা চড়া দামেই কিনে দিতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, এসব নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। কারণ এখানে নির্মল বিনোদনের জন্য আমরা আসি। সরকারের এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। কাউনিয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিঠুল জানান, শুরুতেই এই সেতুটিকে ঘিরে এলাকাবাসী একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্ত কর্তৃপক্ষ কোনো উদ্যোগ নেই। বরং সন্ধ্যার পর এখানে দর্শনার্থীরা আর থাকতে চান না। নিরাপত্তার কারণে। অথচ এখানে মার্জিনাল ডাইক বাঁধের ওপর ছাতা করে দিলে বিশুদ্ধ বাতাসে দর্শনার্থীরা এখানে বসে তিস্তার ভাঙা গড়ার খেলা উপভোগ করতে পারতেন। তিনি বলেন, সরকার পর্যটন কর্তৃপক্ষকে দিয়ে অথবা বেসরকারিভাবে লিজ দিয়েও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে পরে। এতে সরকার বিশাল অংকের রাজস্ব পাওয়ার পাশাপাশি মানুষের খোলা স্থানে নির্মল আনন্দ উপভোগের ব্যবস্থা করে দিতে পারে।

এ ব্যাপারে সেতুটির তদারককারী প্রতিষ্ঠান লালমনিরহাট সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশল আলী নুরায়েন জানান, সেতুটিকে ঘিরে কিভাবে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায় সে ব্যাপারে আমরা সরকারের ওপর মহলে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। ওপর থেকে জট খুললেই সেতুটিকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠবে। কারণ এতো সুন্দর একটি নান্দনিক সেতু দেখতে মানুষ সবসময় আসতেই থাকবে।

দাবির দুইশ বছর : লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের সাথে রংপুরসহ গোটাদেশের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্রিটিশ আমল থেকেই নেই। ১৮৩৮ সালে ব্রিটিশ সরকার রংপুরের কাউনিয়া ও লালমনিরহাটের সদর সীমান্তে তিস্তা নদীর ওপর রেলওয়ে সেতু নির্মাণ করলে শুধু ট্রেন যোগাযোগ চালু হয়। কিন্তু ১৯৩৮ সালে সেটির মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। সাবেক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ ওই রেলওয়ে সেতুতে কাঠের পাটাতন দিয়ে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করেন। সেই থেকে প্রতিদিনই দুর্ঘটনাকে সঙ্গী করে দুই জেলার বাসিন্দারা কষ্টেপিষ্টে চলাফেরা করে আসছিলেন। অনিবার্য বাস্তবতায় এখানে দুইশ বছর ধরে দাবি ওঠে একটি সড়ক সেতু নির্মাণের। ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেয়া হয় রংপুর অঞ্চলের স্বপ্ন বিভোর মানুষগুলোর দুইশ বছরের দাবি, অনেক আন্দোলন, বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা সড়ক সেতু। তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটির উদ্বোধন করেন।

যেভাবে বেড়ে ওঠে তিস্তা সড়ক সেতু : অব্যাহত দাবির প্রেক্ষিতে রেলওয়ে সেতুটির পূর্বপার্শ্বে ২০০১ সালের ১ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিস্তা সড়ক সেতু নির্মাণের ভিত্তি স্থাপন করেন। এরপর প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় সড়ক ও জনপদ বিভাগ সেতুটি নির্মাণের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৬ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পুনরায় সেতুটির নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপরই কুয়েত ফান্ড ফর আরব ইকনোমিক ডেভেলপমেন্ট এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে তিস্তা সড়ক সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়।

 

Loading...

Check Also

খরার কবলে বরেন্দ্র অঞ্চল

রাজশাহী সংবাদদাতা বরেন্দ্র অঞ্চলে খরার কবলে পড়ে বোরো-আমন ধান ক্ষতির মুখে পড়েছে। টানা ১০ দিনের ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *