Home / জেলার খবর / মাতামুহুরী স্নান এখন বিপদসংকুল নদীর ত্রিশটি স্থানে মানবসৃষ্ট চোরাবালি

মাতামুহুরী স্নান এখন বিপদসংকুল নদীর ত্রিশটি স্থানে মানবসৃষ্ট চোরাবালি

কক্সবাজার সংবাদদাতাঃ-
মাতামুহুরী স্নান এখন বিপদসংকুল হয়ে উঠেছে। কক্সবাজার জেলার চকরিয়া অংশে নদীতে শক্তিশালী ড্রেজার এবং শ্যালোমেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলণের কারণে অসংখ্য স্থানে তৈরি হচ্ছে গভীর গর্তসহ চোরাবালি। মানবসৃষ্ট এই চোরাবালির কারণে নদীতে গোসল বা স্নান করা এখন বিপদসংকুল হয়ে উঠছে। প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো স্থানে গোসল করতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে এ ঘটনার শিকার হচ্ছে শিশু-কিশোররা।
পার্বত্য অববাহিকার মাতামুহুরী নদী সরকার ঘোষিত কোনো বালুমহাল নয়। এক সময়ের নিরাপদ মাতামুহুরী গভীরতা কমে আসলেও এমন রূপ কেন ধারণ করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে এজন্য নদীর বিভিন্নস্থানে মানবসৃষ্ট চোরাবালিকেই দায়ী করছেন সচেতন মহল। দুই মাস ধরে নদীর চকরিয়া অংশের বিভিন্ন ইউনিয়নের অন্তত ত্রিশটি স্থানে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করায় সেখানে নতুন করে তৈরি হচ্ছে চোরাবালি। এতে সামনের দিনগুলোতে আরো প্রাণহানির আশঙ্কায় করা হচ্ছে। মানবসৃষ্ট এসব চোরাবালিতে গত ১ বছরে কম করে হলেও ২০ জনের বেশি লোকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ গত রোববার উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের পূর্ব কাকারা এলাকায় মাতামুহুরী নদীতে গোসল করতে নেমে আমজাদ হোসেন (৮) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি প্রভাবশালীরা মাতামুহুরী নদীর পূর্ব কাকারা পয়েন্টে শ্যালোমেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে। এতে ওই পয়েন্টের একাধিক স্থানে গভীর গর্ত হয়ে চোরাবালির সৃষ্টি হয়। গত রোববার সকালে সেখানে গোসল করতে নামে শিশু আমজাদ। এসময় সে চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়ে নিখোঁজ হয়। কিছুক্ষণ পর আমজাদের লাশ পানিতে ভেসে উঠে।
গত বছরের ১৪ জুলাই মাতামুহুরী নদীর চিরিঙ্গা সেতুর কাছের বালুরচরে ফুটবল খেলার পর গোসল করতে নদীতে নামে একদল স্কুলশিক্ষার্থী। তারা সকলেই চকরিয়া গ্রামার স্কুলেরই শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে মাতামুহুরী নদীর চোরবালিতে একে একে তলিয়ে গিয়ে প্রাণ হারায় পাঁচজন শিক্ষার্থী। একটানা ৫-৬ ঘণ্টা তল্লাশি চালিয়ে এবং ডুবুরি দল চট্টগ্রাম থেকে এসব শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করে। একসঙ্গে পাঁচজন কিশোর শিক্ষার্থী অকালেই প্রাণ হারায়। এ ঘটনায় পুরো কক্সবাজারে নেমে আসে শোকের ছায়া। দাবি উঠে নদীতে তলিয়ে যাওয়ার পয়েন্টে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের। এ নিয়ে ওই সময় অনেক হৈ চৈ পড়ে গেলেও পরবর্তীতে ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যায়।
ওই সময় চকরিয়া ফায়ার সার্ভিসের প্রধান জি এম মহিউদ্দিন জানিয়েছিলেন, শ্যালোমেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশে গভীর গর্ত তথা চোরাবালির সৃষ্টি হয়েছিল। এতে ওই চোরাবালিতে পড়ে শিক্ষার্থীরা প্রাণ হারায়।
এছাড়া সম্প্রতি উপজেলার সাহারবিল ইউনিয়নের রামপুর এলাকায় নদীতে গোসল করতে নেমে চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে হয় এক দোকান কর্মচারী। পরে চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি দল এসে তল্লাশি চালিয়ে নদী থেকে ওই কর্মচারীর লাশ উদ্ধার করে। উপরের সাতজনের মতোই একইভাবে গত ১বছরে উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে মাতামুহুরী নদীতে গোসল করতে নেমে প্রাণ যায় অন্তত ২০ জনের। তবে এসব অপমৃত্যুতে বরাবরের মতোই প্রশাসনের কর্মকর্তারা রয়েছেন একেবারেই নির্বিকার। তবে প্রশাসন সবকিছুই অবগত থাকলেও রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতার দাপটের কারণে তারাও অনেকটা অসহায় বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘুরে দেখা যায়, গত দুই মাস ধরে মাতামুহূরী নদীর চকরিয়ার ঘুনিয়া, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, পৌরসভার বিভিন্ন স্থান, সাহারবিলের রামপুর, মাইজঘোনা, কৈয়ারবিল, বাঘগুজারা, বেতুয়া বাজার, কোনাখালীর কন্যারকুম, চিরিঙ্গা ইউনিয়নের সওদাগরঘোনা, চরণদ্বীপসহ অন্তত ৩০টি স্থানে এখন চলছে প্রভাবশালী বালুদস্যুদের অপতৎপরতা। সেখানে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিন বসিয়ে মাতামুহুরী নদী থেকে অবৈধভাবে তোলা হচ্ছে বালু। এতে নদীতে সৃষ্টি হচ্ছে ২০-৩০ ফুট গর্তসহ অসংখ্য চোরাবালি। এই অবস্থায় মানুষ গোসল করতে নামলেই চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছে।
চোরাবালি কেন হয়, এমন প্রশ্ন করা হলে মাতামুহুরী নদীর তিন কিলোমিটারে ড্রেজিয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এস ন্যাশনের কর্ণধার নূরে বশির সয়লাব বলেন, যেখানে শ্যালোমেশিন বা ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয় সেখানে নির্দিষ্ট জায়গায় বড় ধরনের একটি গর্তের সৃষ্টি হয়। আর সেই গর্ত ভরাট হয় পলিমাটিতে। তখন সেই গর্তের মধ্যে কেউ পড়ে গেলে সহজে বের হতে পারে না। ফরে কিছুক্ষণ মধ্যেই তার মৃত্যু ঘটে। তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড আমাকে নদীর তিন কিলোমিটারে ড্রেজিং করার জন্য নিয়োজিত করেছে। সেই মোতাবেক নকশা এবং তিনটি কাটার ড্রেজার মেশিন পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিয়ের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে বালু অপসারণ করছি। নদীর অন্যান্য পয়েন্টে যেসব শ্যালোমেশিন ও ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে, তাতে আমার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষ মনে করছেন নদীর সবখানেই আমি অবৈধভাবে বালু তুলছি, যা কোনো অবস্থাতেই সত্য নয়।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা বলেন, শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর বুকে বিভিন্নস্থানে বড় ধরনের গর্ত তৈরি হয়ে চোরাবালিতে পরিণত হচ্ছে। এতে আগামী বর্ষাকালে নদীর তীর ভেঙে বহু স্থাপনা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বালুদস্যুদের এই অপতৎপরতা বন্ধে জেলা প্রশাসক মহোদয়কে চিঠি দেয়া হয়েছে। শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিন বসিয়ে মাতামুহুরী নদীর বেশকিছু পয়েন্ট থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আশরাফুল আফসার বলেন, মাতামুহুরী নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য কাউকে অনুমতি দেয়া হয়নি। যারা এই অপকর্ম করে নদীতে চোরাবালি সৃষ্টি করছেন তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

Loading...

Check Also

কিশোরীকে বিক্রি মামলায় মুন্সীগঞ্জে একজনের যাবজ্জীবন, ৩ জনের ৭ বছর কারাদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা প্রতিদিন.কম : মুন্সীগঞ্জে এক কিশোরীকে ফুসলিয়ে নিয়ে বিক্রি করার অপরাধে সোমবার দুপুরে ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *