Breaking News
Home / জাতীয় / গ্যাস চুরি আমলে নিচ্ছে না কেউ
গ্যাসের সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব

গ্যাস চুরি আমলে নিচ্ছে না কেউ

# দিনে ঘাটতি প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট # সংকট নিয়ে খোঁড়া অজুহাত # জনজীবনে অস্বস্তি

আমিনুল হক ভূইয়া
তীব্র শীত না পড়লেও রাজধানীতে গ্যাস সংকট কাটছে না। নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের অবস্থা খুবই নাজুক। শীতেকালে প্রায় ১৫ শতাংশ গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায়। কাপড় শুকানো, পানি গরম করা থেকে শুরু করে নানা কাজে বাড়তি গ্যাসের প্রয়োজন হয়। ফলে গ্যাসের চাহিদাও বাড়ে। কিন্তু চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কম থাকায় সংকট কাটছে না। দক্ষিণ গোড়ানের গৃহবধূ মাজেদা বেগম জানান, ভোররাতে ওঠে গৃহস্থালি কাজ শেষ করতে হয়। সকাল হয়ে আসার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্যাসের চুলার দম কম থাকে। গোড়ান, খিলগাঁও, বাসাবো, যাত্রাবাড়ি, মালিবাগ, বনশ্রী, রামপুরা, পুরাতন ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকাসহ রাজধানীতে গ্যাস সংকট চলছে। জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) যোগ হলেও ঢাকার গ্যাস-সংকটের উন্নতি হয়নি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাঝারি শীতেই দিনে তো বটেই, অনেক এলাকায় রাতেও চুলা জ্বলে নিবু নিবু। গভীর রাতে গ্যাস এলেও চুলায় আঁচ ছিল খুবই কম। তিতাস এলাকায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে কমবেমি ১৬শ থেকে ১৭শ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রতিদিন ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

রাজধানীর গ্যাস সংকটের বিষয়ে তিাসের পরিচালক অপারেশন কামরুজ্জামান খান বলেন, গ্যাস সংকট কিছুটা থাকবেই। কারণ শীতকালে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায়। পানি গরম করা, কাপড় শুকানো, খাবার গরম করা ইত্যাদিও পাশাপাশি ঘর গরম রাখার জন্যও অনেকে দিনের পর দিন গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখে। এজন্য গ্যাসের চাহিদাটা বেড়ে যায়। এছাড়া কারিগরি সমস্যার কারণেও অনেক সময় সব জায়গায় সমান গ্যাস সরবরাহ করা যায় না। তাছাড়া দিন দিন চাহিদাও বাড়ছে। কামরুজ্জামান খান বলেন, চট্টগ্রামে এখন ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় গ্রিড থেকে আরও ৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ প্রায় বন্ধ ছিল। এর মধ্যে আগে গড়ে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হতো। এলএনজি চট্টগ্রামে সরবরাহের ফলে ঢাকায় কিছু বাড়তি গ্যাস পাচ্ছে। তিতাস কর্তৃপক্ষ জানায়, সব মিলিয়ে বর্তমানে ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাসের চাহিদা রয়েছে তাদের অধীন এলাকাগুলোয়। এছাড়া নতুন অনুমোদিত শিল্পে সংযোগ দেয়া শুরু হলে আরও ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের চাহিদা বাড়বে। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। এর মধ্যে আবাসিকে চাহিদা আছে ৩৫০-৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, যে পরিমাণ এলএনজি এসেছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংযোগও বাড়ানো হয়েছে। ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আনা হচ্ছে। চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট চরম আকার নিয়েছে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জেতো গ্যাস সংকট বারো মাসি। তারপরও গ্যাস চুরি তো বন্ধ করা যায়নি। গ্যাস সংকটকে মানুষ এখন জিম্মি হয়ে পড়েছে। উচ্চমূল্যে এলপিজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এতে সংসারের বাজেটে ভাটা পড়ছে। চুরি বন্ধ করা না গেলে সংকটের লাগাম টানা যাবে না। অথচ চুরি কেউ আমলে নিচ্ছে না।

এদিকে নসারায়ণগঞ্জের শহর ও শহতলীর বিভিন্ন এলাকায় ফের গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। শীতের মৌসুমে গ্যাসের সংকটের কারণে বিভিন্ন বসত বাড়িতে গৃহিণীরা চরম সমস্যায় পড়ছেন। দিনের বেলায় গ্যাস সংকটের পাশাপাশি রাতেও সংকট দেখা দিচ্ছে। জানা গেছে, শহর ও শহরতলীর কোনো কোনো এলাকায় সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। এরপর সন্ধ্যার পর থেকে গ্যাস থাকলেও এর পরিমাণ খুবই কম থাকে। আবারো রাতের সময়ে গ্যাসের পরিমাণ অনেকটা কমে আসে। তবে অধিকাংশ এলাকায় দুপুর ব্যতীত সকাল বিকেল দু’বেলা গ্যাস থাকে না। এরপর সন্ধ্যা থেকে গ্যাস ফিরে এলেও তার পরিমাণ অনেকটা কম থাকে। আবার রাত হতেই গ্যাস চলে যায়। এভাবে গ্যাস নিয়ে তীব্র বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় জনসাধারণকে। রাতের বেলা গ্যাস থাকে বলে অনেক গৃহিণী রাত জেগে রান্না করে থাকেন। জেলার নতুন কোর্ট, ফতুল্লা স্টেডিয়ামের পাশে, নতুন পালপাড়া, কাশীপুর, ভূইগড়, জামতলা ধোপাপট্টি, আমলাপাড়া, দোওভোগ মাদ্রাসা এলাকা, ফতুল্লার নরসিংপুর, সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি, গোগনগর, মাসদাইর, সর্দার পাড়া, তল্লা বড় মসজিদ, পাইকপাড়া, ভোলাইল, জল্লারপাড়া, পাক্কা রোড, রঘুনাথপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যা থেকে রাত গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না।

চট্টগ্রামে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাস প্রবাহ কমেছে এক তৃতীয়াংশেরও বেশি। এর ফলে বাসাবাড়ি ও গ্যাস নির্ভর কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে চরম সঙ্কট। গত দুইদিন ধরে নগরীর বেশিরভাগ আবাসিক এলাকায় দিনের বেলা গ্যাসের চুলা জ্বলেনি। দুপুরের পর গ্যাস এলেও মধ্যরাতের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না। প্রেসার কমে যাওয়ায় কমে গেছে গ্যাসের প্রবাহও। এতে আবাসিক এলাকাসহ পুরো চট্টগ্রামজুড়ে এখন গ্যাস সঙ্কট চলছে। সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সকাল ১০টার পর থেকেই গ্যাসের প্রেসার একেবারে কমে আসছে। দুপুর ২টার পর আবার ধীরে ধীরে তা স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও স্বাভাবিক হয় মধ্যরাতে। ফলে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে গ্যাস নির্ভর সব কাজই বন্ধ থাকে। নগরীর ইপিজেড এবং হালিশহরের মতো ঘনবসতি এলাকায় গ্যাসের অভাব চরম আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন পোশাক কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক ভোরে উঠে রান্না করেন। কিন্তু ভোর থেকে দুপুর চুলা না জ্বলায় তারা পড়েছেন সমস্যায়। বর্তমানে নগরের রহমতগঞ্জ, আসকার দীঘিরপাড়, বাকলিয়া, পাথরঘাটা, ঘাটফরহাদাবেগ, খুলশী, নাসিরাবাদ, মুরাদপুর, লালখানবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাস থাকছে না। নাসিরাবাদ হাউজিংয়ের বাসিন্দা হামিদা আক্তার অভিযোগ করেন, সকাল ৬টা থেকে তার বাসায় গ্যাস থাকে না। আসে দুপুর দেড়টা-দুটোর দিকে। এই সময়ে চুলায় গ্যাস একেবারেই থাকে না। ভাত রান্নাতো দূরের কথা পানিও গরম করা যায় না।

তিনি বলেন, যেহেতু গ্যাস থাকেই না তাই বিকল্প উপায়ে রান্নার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। অন্যবার শীতের সঙ্গে এবার শীতে গ্যাস সরবরাহে কোনও পার্থক্য দেখছিন না। এলএনজি আসলে আর কোনো সঙ্কট থাকবে না বলেও আমাদের শোনানো হয়েছিল। কেবল আবাসিক এলাকাই নয়, শীতের তীব্রতা বাড়ার পর শিল্প এলাকায়ও চাপ কমে গেছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানি শিল্পের প্রভাব প্রত্যক্ষভাবে পড়েছে। অনেক কারখানায় বয়লার ঠিকমতো কাজ করছেনা।

কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির (কেজিডিসিএল) কর্মকর্তা মোহময় দত্ত জানিয়েছেন, বলেন, এমনিতে শীতকালে গ্যাসের ব্যবহার একটু বেড়ে যায়। তার ওপর কমেছে এলএনজি সরবরাহ। চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। এখানে গ্যাস দেয়া হচ্ছে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কম। এর মধ্যে আমদানিকৃত এলএনজি রয়েছে ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। বাকিটুকু ন্যাশনাল গ্রিড থেকে দেয়া হয়। এই গ্যাসের প্রায় অর্ধেকই চলে যাচ্ছে দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র-কাফকো ও সিইউএফএলে এবং কর্ণফুলী পেপার মিলে। তাই রেশনিং করেও গ্যাস সঙ্কট কাটানো যাচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, সামনের কৃষি মৌসুমকে সামনে রেখে কাফকো এবং সিইউএফএল একই সাথে উৎপাদনে গেছে। ফলে আমদানিকৃত এলএনজির একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে সার উৎপাদনে। কাফকো এবং সিইউএফএল বর্তমানে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করে সার উৎপাদন করছে। এ ছাড়া রাউজান তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিকলবাহা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণফুলী পেপার মিলে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি গ্যাস ব্যবহার করে। হাতে থাকা বাকি একশ মিলিয়নেরও কম গ্যাস দিয়ে চট্টগ্রামের শিল্পখাত, বানিজ্যিক খাত, ৬০টিরও বেশি সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, ৬ লাখেরও বেশি আবাসিক গ্রাহকের গ্যাসের যোগান দিতে হচ্ছে। এতে করে গ্যাসের স্বাভাবিক প্রেসার অত্যন্ত কমে গেছে। আর জানতে চাইলে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার খায়ের আহমদ মজুমদার জানান, এলএনজি সরবরাহ না থাকায় এ সঙ্কট চলছে। ওমান এখন এলএনজি দিতে পারছে না। শুধু কাতার থেকে এখন এলএনজি আসছে। ফেব্রæয়ারির সপ্তাহে এলএনজি নিয়ে চতুর্থ জাহাজটি আসার কথা রয়েছে। সেটি জাহাজটি আসলে এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো যাবে।

ঢাকা প্রতিদিন ডটকম/১৪ জানুয়ারি/এসকে

Loading...

Check Also

একদিনের সিরিজ জিতে ইতিহাস ভারতের

ক্রীড়া ডেস্ক, ঢাকা প্রতিদিন.কম ১৯ জানুয়ারি : খরগোশের দৌড় নয়, মাহি এগিয়ে যাচ্ছেন কচ্ছপের পায়ে। ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *