Breaking News
Home / জাতীয় / সরকারের আশ্বাসের পরও পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ-সংঘর্ষ-অবরোধ

সরকারের আশ্বাসের পরও পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ-সংঘর্ষ-অবরোধ

# দাবি বাস্তবায়নে কাজ করছে কমিটি
# দাবি বাস্তবায়নে শ্রমিক সংগঠনগুলোর কর্মসুচি পালন
# আশুলিয়া-গাজীপুরে ৩০টি কারখানায় ছুটি
# নৈরাজ্য ঠেকাতে প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

এসএম দেলোয়ার হোসেন/ এম এ হালিম : সরকারের আশ্বাসের পরও সরকার ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামোতে ন্যূনতম মজুরি, বেতন-ভাতাদিসহ অন্যান্য সুবিধা বাস্তবায়নের দাবিতে পঞ্চম দিনের মতো আজ বৃহস্পতিবারও ফের রাস্তায় নেমেছে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা। এসময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এমনকি সাভারের আশুলিয়াসহ গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। সাভারের আশুলিয়ায় শ্রমিকদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ রাবার বুলেট-টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ করে দেয়। থেমে থেমে সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ-শ্রমিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছে। এসময় আশুলিয়া-গাজীপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত ২৫ জনকে আটক করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে পুলিশ বলছে কাউকে আটক করা হয়নি। ধাওয়া দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ কওে দেয়া হয়েছে। শ্রমিকদের টানা বিক্ষোভের মুখে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে আজ সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুর এলাকায় নতুন করে অন্তত আরো ৩০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ। এর আগে বিক্ষোভ-অবরোধের চতুর্থ দিনের ঘটনায় সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরে অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে গাজীপুরে বিজিজি মোতায়েন করা হয়। এরপর থেকেই গাজীপুরসহ আশপাশের এলাকায় থমথমে অবস্থা ও শ্রমিকদের মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করছে। রাজধানী ঢাকাসহ সাভার-গাজীপুর এলাকায় থেমে থেমে শ্রমিক বিক্ষোভ চলাকালে বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে যানবাহনে আটকা পড়ে দিনভর চরম দুর্ভোগে পড়েন নানা শ্রেণী পেশার কর্মজীবি সাধারণ মানুষসহ শিক্ষার্থীরা। শ্রমিক অসন্তোষ ঠেকাতে সরকারের নির্দেশে পুলিশের উদ্যোগে কোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই মালিকপক্ষের আশ্বাসে পঞ্চম দিনের মতো দুপুরের পরপরই বিক্ষোভ-অবরোধ তুলে নেয় শ্রমিকরা। এদিকে নতুন বেতন কাঠামো এ মাসের মধ্যেই বাস্তবায়নের কাথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়নে গঠিত কমিটি কাজ করছে বলে দাবি করেছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান। এছাড়া শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে আজ এক টুইট বার্তা দিয়েছেন জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার ফাহরেনহোল্জ। অপরদিকে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেয়ার আহŸান জানিয়ে আজ সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পৃথকভাবে মানববন্ধন-সমাবেশ কর্মসুচি ও বিবৃতি প্রদান করেছেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনগুলো।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, এক মাসের সময় চেয়ে সরকার ঘোষিত নতুন মজুরি কাঠামো পর্যালোচনার জন্য কমিটি করে দিলেও দাবি আদায়ে টানা পঞ্চম দিনের মতো আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই রাজধানীর পল্লবীর কালশী, উত্তরখান-দক্ষিণখান, সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেছে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। শ্রমিক বিক্ষোভের মুখে এসব এলাকার সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে আশপাশের সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ বিকল্প সড়ক দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। শ্রমিক বিক্ষোভ চলাকালে আশুলিয়ায় পুলিশের সাথে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে শ্রমিক-পুলিশসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়। উত্তেজিত শ্রমিকদের বেপরোয়া আচরণে পরিস্থিতি উত্তরণে আশুলিয়া ও গাজীপুরের অন্তত ৩০টি তৈরি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ।

আন্দোলনরত শ্রমিকরা ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, তারা সরকার ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামোতে ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিতকরণ ও অপারেটর-হেলপারের মধ্যে বেতন বৈষম্য দূর করার দাবিসহ বিভিন্ন দাবিতে গত এক সপ্তাহ ধরে সড়কে নেমে বিক্ষোভ করছেন। ইতোমধ্যেই তারা কয়েকদফা চেষ্টা করেও মালিকপক্ষের সাথে এ বিষয় নিয়ে কোন বৈঠকে বসতে পারেননি। এসব দাবি উত্থাপন করা হলে মালিকপক্ষ তাদের নানাভাবে তিরস্কার-জুলুম নির্যাতনসহ নানাভাবে হুমকি-ধমকি শুরু করে। তাদের যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবি পূরণের আশ্বাস দেয়া হলেও অদ্যবধি বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে সরকারের আশ্বাসেও তারা এখনো কোন আস্থা রাখতে না পেরে পঞ্চম দিনের মতো গতকালও পল্লবীর কালশী রোডে বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছেন। তবে দুপুরের দিকে পুলিশের উদ্যোগে মালিকপক্ষের আশ্বাস পেয়ে তারা তাদের চলমান কর্মসুচি স্থগিত করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, নতুন মজুরি কাঠামোসহ ১০ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে পঞ্চম দিনের মতো আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই রাজধানীর পল্লবীর কালশী, মিরপুর-কাফরুলের শেওড়াপাড়া এলাকার রাস্তায় অবস্থান নেন বেশ কয়েকটি গার্মেন্টসের শ্রমিকরা। এর ফলে মিরপুর-বিমানবন্দর সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন নানা শ্রেণী পেশার কর্মজীবি নগরবাসী ও শিক্ষার্থীরা। এসময় সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুরো এলাকায় বাড়তি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।

শেওড়াপাড়ায় আলফা নিটিং ওয়্যারের অপারেটর সজীব আহমেদ বলেন, সরকার আমাদের জন্য যে বেতন নির্ধারিত করেছে তা মালিকেরা আমাদের দেয় না। গত মাসের বেতন ৭ তারিখ দেয়ার কথা ছিলো। এখনো তা দেয়নি। জে কে ফ্যাশনের কর্মী আমেনা খাতুন নামে বলেন, আমাদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার টাকা দেয়ার কথা। কিন্তু দেয়া হচ্ছে ৯ হাজার ৭শ’ টাকা। বেসিক বেতন ৭ হাজার টাকা দেয়ার কথা, সেটিও দিচ্ছে ৫ হাজার ৭শ’ টাকা। এভাবে সব বিষয়েই আমাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। আর শ্রমিক ঠকিয়ে লাভবান হচ্ছেন মালিকপক্ষ। কয়েকটি গার্মেন্টসে কর্মীদের মালিকপক্ষ আটকে রেখেছে এমন অভিযোগ করেছেন বিক্ষোভরত কর্মীরা। আটকে থাকা কর্মীদের বের করে আনতে গার্মেন্টসগুলোর প্রধান ফটক ভাঙচুর করেছেন তারা। শেওড়াপাড়ায় বিক্ষোভে অংশ নেয়া আলফা ইউনিট-১ লিমিটেডের পোশাক শ্রমিক মিজানুর রহমান বলেন, চেয়ারম্যান স্যার আমাদের কথা দিয়েছিলেন- আমাদের দাবি-দাওয়া মানবেন কিন্তু কথা অনুযায়ী কাজের মিল পাইনি। তাই বাধ্য হয়ে আমরা আন্দোলনে নেমেছি। আন্দোলনের পাশাপাশি শ্রমিকরা ১০ দফা দাবি জানিয়েছেন। এগুলো হচ্ছে- ১. তিন গ্রেডের অপারেটরের বেতন ১২ হাজার টাকা করতে হবে, ২. বেসিক ঠিক করতে হবে, ৩. ওভারটাইমের হার ঠিক করতে হবে, ৪. হাজিরা বোনাস ৬শ’ টাকা করতে হবে, ৫. টিফিন বিল কমপক্ষে ৪০ টাকা করতে হবে, ৬. আয়রনম্যান পদে কর্মরতদের গ্রেড ৩ করতে হবে, ৭. ছুটির সব টাকা একসঙ্গে দিতে হবে, ৮. দাবি আদায়ের আন্দোলনে অংশ নেয়া কাউকে বরখাস্ত করা যাবে না, ৯. ৬ মাস ডিউটির পর মাতৃত্বকালীন ছুটি দিতে হবে এবং ১০. পূর্ববর্তী সময়ে দেয়া কথা অনুযায়ী পার্শ্ববর্তী অন্যান্য গার্মেন্টসের মতো সরকারি হিসেবে বেতন-ভাতা নির্ধারণ ও তা চালু করতে হবে।

এদিকে কালশীতে সড়ক অবরোধ করে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলাকালে মূল সড়ক থেকে কর্মীদের সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের কয়েক দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর পুলিশের উদ্যোগে দুপুরের দিকে স্ট্যান্ডার্ড গ্রæপের মালিক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এসে সরকার ঘোষিত নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবি পূরণের আশ্বাস দিলে দুপুরের পরপরই তারা কর্মসূচি প্রত্যাহার করে সড়ক ছেড়ে কাজে যোগদান করেন। এরপরই ওই সড়কে যান চলাচল শুরু হয়।

পল্লবী থানার পরিদর্শক (অপারেশন) ইমরানুল হাসান প্রিন্স ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, গত কয়েকদিনের মতো আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কালশীর মূল সড়কে ২২তলা গার্মেন্টস, স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টসসহ কয়েকটি গার্মেন্টসের শ্রমিকরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছিলেন। পরে মালিকপক্ষ দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দিলে শ্রমিকরা সরে যান। তিনি জানান, শ্রমিকদের প্রাপ্য আদায়ে পুলিশ বারবারই সহযোগিতার কথা বলে আসছে। জনভোগান্তি সৃষ্টি না করে সুষ্ঠুভাবে দাবি আদায়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। বর্তমানে পুরো এলাকার পরিস্থিতি ও যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান ইমরানুল হাসান প্রিন্স। এদিকে মিরপুর মডেল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) দুলাল হোসেন ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কিছু করলে সেখানে হস্তক্ষেপ করবে না পুলিশ। কিন্তু তারা বা অন্য কেউ এ ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করলে বা সড়ক অবরোধ করে বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। মিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) দাদন ফকির জানান, পুলিশের উদ্যোগে মালিকপক্ষকে ডেকে সড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে নিতে বলেছি। তারেদকে বলা হয়েছে, বিক্ষোভ ও আন্দোলন যদি করতেই হয় তাহলে কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের ভেতরে করতে হবে। জনসাধারণের চলাচলে বাধা, জনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তায় বাধা দেয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে এর কোন ব্যত্যয় ঘটলে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যবস্থা নেবে পুলিশ।

এদিকে শ্রমিক বিক্ষোভের পঞ্চম দিনেও আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই একই দাবিতে উত্তরখান-দক্ষিণখান এলাকার বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেয় শ্রমিকরা। এসময় তারা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ-সমাবেশের চেষ্টা করলেও পুলিশি তৎপরতায় তারা সড়কে দাঁড়াতেই পারেনি।

সাভার : সদ্য ঘোষিত মজুরি কাঠামো বৈষম্য নিয়ে পঞ্চম দিনের মতো গতকালও সাভারের আশুলিয়ায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছে। আশুলিয়ায় পুলিশের সাথে শ্রমিকদের ব্যাপক ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসময় পুলিশ ও শ্রমিকসহ আহত হয়েছে অন্তত ৩০ জন। আজ সকাল সাড়ে ৮টার দিকে টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের আশুলিয়ার বেরন এলাকায় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও শ্রমিকরা জানায়, আজ সকালে বেরন এলাকার শারমিন গ্রæপের এ.এম ডিজাইন কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি দিয়ে সড়কে বেরিয়ে আসে। এসময় শ্রমিকরা আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ বন্ধুসুলভ আচরনের মাধ্যেমে বাঁধা প্রদান করে। পরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ারসেল নিক্ষেপ করলে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এসময় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ব্যাপক ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শ্রমিক ও পুলিশসহ আহত হয় অন্তত ৩০ জন । পরে বিজিবি ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্যদের উপস্থিতিতে প্রায় ১ ঘন্টা পর টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপজেড সড়কে যানচলাচল স্বাভাবিক হয়। অন্যদিকে, সাভারের উলাইলে ষ্ট্যান্ডার্ড গ্রæপের সামনে শ্রমিকরা জড়ো হলেও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই বাসায় ফিরে যায় এবং আগামী শনিবার শ্রমিকরা কাজে যোগদান করবে বলে জানিয়েছেন কারখানাটির জেনারেল ম্যানেজার আব্দুর রাজ্জাক। আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহাদাত হোসেন ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনায় আশুলিয়ার কাঠগড়া ও জামগড়াসহ বেশকিছু এলাকার প্রায় ১০টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

গাজীপুর : সরকার ঘোষিত ন্যূনতম বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের দাবিতে টানা পঞ্চম দিনে আজ বৃহস্পতিবার গাজীপুরের ভোগড়া, চান্দনা চৌরাস্তা ও বড়বাড়ি এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। এসময় কারখানার শ্রমিকদের একটি অংশ কারখানায় হামলা করে কাঁচ ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। দাবি আদায়ে তারা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারখানা এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে অন্তত ১৫টি কারখানা।

পুলিশ ও শ্রমিকরা জানায়, আজ বৃহস্পতিবার ভোগড়া এলাকার এ্যাপারেলস প্লাস নামের একটি কারখানায় শ্রমিকদের বেতন দেয়ার কথা ছিল। কর্তৃপক্ষ পূরনো বেতন কাঠামো অনুসারে বেতন দেয়া শুরু করলে শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তারা নতুন বেতন কাঠামো অনুসারে বেতনের দাবি জানিয়ে কারখানা প্রাঙ্গনে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে তারা কারখানা থেকে বের হয়ে মিছিল নিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে গিয়ে অবরোধের চেষ্টা করে। এসময় তারা যানবাহনে ইট পাটকেল ছুঁড়তে থাকলে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। একই দাবিতে চান্দনা চৌরাস্তা, বড় বাড়ি এলাকায় বিক্ষোভে নামেন শতশত কারখানা শ্রমিক। তবে পুলিশের হস্তক্ষেপে মহাসড়কে দাঁড়াতে পারেনি তারা। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এসব এলাকায় অন্তত ১৫টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে গাজীপুর মেট্টোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শরীফুর রহমান ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে মহাসড়কের পাশের বেশ কয়েকটি কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে পুরো পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং অধিকাংশ কারখানায় যথারীতি কাজ চলছে।

এদিকে শ্রমিক বিক্ষোভের চতুর্থ দিনে বুধবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দায়িত্বপ্রাপ্ত নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি গণমাধ্যমকে বলে, এ মাসের মধ্যেই পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। তাই সড়কে নেমে বিশৃঙ্খলা ছেড়ে শ্রমিকদের কাজে যোগদানের আহŸান জানান তিনি। তবে এ বিষয়টি নিয়ে কেউ বা কোন মহল ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করলে তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে বরেও হুঁশিয়ারী দিয়েছেন টিপু মুনশি।

তিনি আরো বলেন, নতুন গ্যাজেটে কেউ যদি বেতন কম পেয়ে থাকেন, তা চলতি মাসের বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। চলতি মাসের বেতনের সঙ্গে সেই টাকা পরিশোধ করা হবে। জানুয়ারি মাসে কোনো শ্রমিককে কম বেতন দেওয়া হবে না। সমস্যা সমাধানে কাজ করবে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি। এদিকে মজুরি নিয়ে পোশাক শ্রমিকদের যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে, তার সমাধানে দ্রæত কাজ করার কথা জানিয়ে সবাইকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান। মজুরি কাঠামো পর্যালোচনায় একদিন আগে কমিটি গঠনের পরও শ্রমিকদের বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার রাতে ঢাকায় নিজের সরকারি বাড়িতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে এই আহ্বান জানান তিনি। মন্নুজান বলেন, আমি এটুকু নিশ্চিত করতে পারি যে একজন শ্রমিক এখন যে মজুরি পাচ্ছেন, তা নতুন বেতন কাঠামোর কারণে কোনো অবস্থাতেই কমবে না। কারণ যখন ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে একজন শ্রমিকের মজুরি বাড়ে, তা কনভেনশন হয়ে যায়। এই মজুরি আর কমানোর কোনো সুযোগ থাকে না। এদিকে পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে এই সংঘাতের একটি শান্তিপূর্ণ ও ন্যায্য সমাধান প্রত্যাশা করেছেন জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার ফাহরেনহোল্জ। আজ এক টুইটে তিনি বলেন, পুলিশের ধর্মঘটকারী গার্মেন্টস শ্রমিকদের দমন করা উচিত নয়। সমঝোতা করতে হবে কারখানার মালিকদের। ন্যায্য বেতন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ দিন। দুর্ঘটনার বীমা চালু করুন। সরকারের পেছনে গিয়ে লুকোবেন না। আরেক টুইটে তিনি লিখেছেন, আমি এই সংঘাতের একটি শান্তিপূর্ণ ও ন্যায্য সমাধানের পক্ষে। বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের অন্যতম জার্মানি। ন্যায্য বেতনের দাবিতে কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ করছেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা। তাদের অভিযোগ, সরকার তাদের জন্য যে নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়েছে, মালিকপক্ষ সে অনুযায়ী বেতন দিচ্ছে না। বরং তাদের নানাভাবে অন্যায়-অবিচারের শিকার হতে হচ্ছে। তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা নির্ধারণ করে গত ২৫ নভেম্বর গেজেট প্রকাশ করে সরকার। ডিসেম্বরের ১ তারিখ থেকে তা কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল সেখানে। অর্থাৎ জানুয়ারির বেতন নতুন কাঠামোয় পাবেন শ্রমিকরা।

এদিকে হত্যা, হামলা, নির্যাতন সমাধান নয়, সকল গ্রেডে সমান হারে মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে অবিলম্বে সকল কারখানা খুলে শ্রমিকদের দাবি মেনে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি। আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভা প্রধান তাসলিমা আখতার, সাধারণ সম্পাদক জুলহাসনাইন বাবু, সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম শামার এক যৌথ বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়। সাভারের উলাইলে আন-লিমা কারখানার শ্রমিক ২২ বছর বয়সী সুমন মিয়াকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়ে বিবৃতিতে বক্তারা বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরেই উত্তরা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, মিরপুরে শ্রমিকরা মজুরি বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং বকেয়া বেতন পরিশোধ, অবৈধ ছাঁটাইসহ অন্যান্য কারখানাভিত্তিক দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে আসছিলেন। শ্রমিকদের এই অসন্তোষের আসল কারণকে পাশ কাটিয়ে সমাধানে দ্রæত উদ্যোগ না নিয়ে মালিকপক্ষ কারখানা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে, যেটি শিল্পের জন্য ক্ষতি বয়ে আনবে। মালিক এবং সরকারপক্ষ সমস্যার যথাযথ সমাধান না করে শ্রমিকদের আন্দোলন বন্ধ করতে দমনের পথ বেছে নিয়ে পরিস্থিতিতে আরো জটিল করে তুলেছে। ব্যাপক পুলিশি হামলার ফলে শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন সুমন মিয়া। গুরুতর আহত অবস্থায় আছেন আরও কয়েকজন শ্রমিক বলে বিবৃতিতে জানানো হয়। শ্রমিক সংহতির নেতারা বলেন, গত বছরে ঘোষিত নতুন মজুরিতে সকল গ্রেডের সমান হারে মজুরি বৃদ্ধি না পাবার বিষয়টি পাশ না কাটিয়ে এ বিষয়য়ে দ্রæত উদ্যোগ নিতে হবে। সুমন মিয়া হত্যায় জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বর্তমানে শ্রমিকরা ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছেন জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, দমন-নির্যাতনের মধ্যদিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না বরং তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে এই সংকট থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অপরদিকে সাভারে গার্মেন্টস শ্রমিক সুমন হত্যাকারীর গ্রেফতার ও শ্রমিকদের দমন-নিপীড়নের প্রতিবাদে আজ বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে পৃথক মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, ফ্যাসিবাদী এ সরকার লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছে। এরা অবৈধভাবে আবারও ক্ষমতা দখল করে গার্মেন্টস মালিক ও পুলিশের স্বার্থ কায়েম করছে। শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক দাবি মজুরি বৃদ্ধি, এটা কোনো চক্রান্ত নয়। শ্রমিক পেট ভরে খেয়ে বেঁচে থাকতে চায়। গুলি চালিয়ে রুটি রুজির দাবি দাবিয়ে রাখা যাবে না। গণতান্ত্রিক বাম জোটের গণসংহতি আন্দোলনের সমাবেশে সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা শাহ আলমের সভাপতিত্বে ও সাজ্জাদ জহির চন্দনের পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা তাসলিমা আক্তার, বাসদের (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নেতা সুবাংশ চক্রবর্তী, বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির কমরেড সাইফুল হক, বাসদের বজলুর রশিদ প্রমুখ।

প্রসঙ্গত, গত কয়েক দিন ধরে পোশাক শ্রমিকরা তাদের মজুরি কাঠামোর অসামঞ্জস্যের অভিযোগ তুলে রাস্তায় আন্দোলন করছেন। আজ বৃহস্পতিবার-বুধবারও রাজধানীর মিরপুরের কালশি, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন রাস্তায় অবস্থান নেন পোশাক শ্রমিকেরা। পুলিশের সঙ্গে কয়েকটি জায়গায় তাদের সংঘর্ষও হয়েছে। নতুন মজুরি কাঠামো পর্যালোচনার জন্য গত ৮ জানুয়ারি শ্রম ভবনে এক বৈঠকে মালিক পক্ষের পাঁচজন, শ্রমিক পক্ষের পাঁচজন এবং সরকারের বাণিজ্য সচিব ও শ্রম সচিবকে নিয়ে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এই কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে মজুরির অসঙ্গতিগুলো খতিয়ে দেখবে এবং সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নেবে বলে জানানো হয়। মঙ্গলবারের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া পোশাক শ্রমিকদের বেতন কাঠামোতে কোনও বৈষম্য বা অসঙ্গতি থেকে থাকলে জানুয়ারি মাসের মধ্যেই তা সংশোধন করা হবে বলে জানানো হয়। ফেব্রæয়ারিতে সংশোধিত গ্রেডিংয়েই বেতন পাবেন শ্রমিকরা। সেই হিসেবে আজ বৃহস্পতিবার এই কমিটি তাদের প্রথম সভা করেছে।

ঢাকা প্রতিদিন ডটকম/১০ জানুয়ারি/এসকে

Loading...

Check Also

একদিনের সিরিজ জিতে ইতিহাস ভারতের

ক্রীড়া ডেস্ক, ঢাকা প্রতিদিন.কম ১৯ জানুয়ারি : খরগোশের দৌড় নয়, মাহি এগিয়ে যাচ্ছেন কচ্ছপের পায়ে। ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *