Home / জাতীয় / অরিত্রীর আত্মহত্যার মামলায় শিক্ষিকা হাসনা হেনা কারাগারে

অরিত্রীর আত্মহত্যার মামলায় শিক্ষিকা হাসনা হেনা কারাগারে

# মৃত্যুর দায় নিতে রাজি নন হাসনা হেনা
# অধ্যক্ষসহ দু’জনকে ধরতে চলছে অভিযান

এসএম দেলোয়ার হোসেন: ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় স্কুলটির বরখাস্ত শ্রেণি শিক্ষিকা হাসনা হেনাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার বিকেল পৌনে ৪টায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক কামরুল হাসান তালুকদার মামলার সষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য শিক্ষিকা হাসনা হেনাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। এদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী জাহাঙ্গীর আলম জামিনের আবেদন করেন। আর বাদীপক্ষের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর হেমায়েত উদ্দিন জামিনের বিরোধিতা করেন। ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আবু সাঈদ শুনানি শেষে জামিনের আবেদন না মঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এর আগে গত ৪ ডিসেম্বর রাজধানী পল্টন থানায় অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসসহ তিনজনের বিরুদ্ধে দÐবিধির ৩০৫ ধারায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হলে ঘটনার তদন্তসহ অভিযুক্ত আসামিদের গ্রেফতারে অভিযানে নামে ডিবি পুলিশের একটি দল। এরপর বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে গত ৫ ডিসেম্বর রাত ১১টার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি আবাসিক হোটেলের কক্ষ থেকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শ্রেণি শিক্ষিকা ও মামলার ৩ নম্বর আসামি হাসনা হেনাকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (পূর্ব) একটি টিম। এদিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় দায় নিতে রাজি হননি হাসনা হেনা। তিনি বলেছেন, অধ্যক্ষের নিদের্শে তিনি কেবল তার দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া মামলার অপর দু’আসামি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস ও প্রভাতী শাখার প্রধান জিন্নাত আরাকে ধরতে গোয়েন্দা পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি-পূর্ব) উপ-কমিশনার খন্দকার নুরুন্নবী বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, আইনি ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা পাওয়ার পর থেকেই অভিযুক্ত শিক্ষকদের গ্রেফতারে তৎপরতা শুরু করেন গোয়েন্দারা। শিক্ষিকা হাসনা হেনার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে রাত ১১টায় উত্তরার ওই আবাসিক হোটেলের একটি কক্ষে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে তাকে গ্রেফতার করে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়। এরপর অরিত্রী অধিকারী আত্মহত্যার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ডিবি পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শিক্ষিকা হাসনা হেনা পুলিশকে জানিয়েছেন, পরীক্ষা চলাকালে শ্রেণিকক্ষে পরীক্ষার্থীর মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সেক্ষেত্রে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে অরিত্রীর কাছে মোবাইল ফোন পাওয়ায় তা জব্দ করে স্কুলের অধ্যক্ষের কাছে বিষয়টি জানানো ও জমা দেন। তিনি কেবল অধ্যক্ষের নির্দেশনা পালন করেছেন। এর বেশিকিছু নয়। গোয়েন্দা পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে শিক্ষিকা হাসনা হেনা পুলিশকে আরো বলেছেন, তার কাজ হলো কোনো মেয়ে যদি ঝামেলা করে তাহলে তার বাবা-মাকেসহ ওই ছাত্রীকে নিয়ে প্রিন্সিপালের কাছে দাঁড় করানো। এ ক্ষেত্রে মোবাইল পাওয়ার কারণে তিনি তাই করেছেন। এছাড়া তার আর কোনো দায় নেই। অরিত্রির বাবা-মায়ের সাথে তার কোনো কথাও হয়নি। স্কুলের নির্দেশনা পালনে অধ্যক্ষ তাকে যা বলেছেন, তিনি কেবল তাই করেছিলেন।

ডিসি খন্দকার নুরুন্নবী জানান, আজ বিকেলে গ্রেফতার ভিকারুননিসার শ্রেণিশিক্ষিকা হাসনা হেনাকে আদালতে হাজির করে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে কারাগারে আটক রাখার জন্য আবেদন করা হয়। বিজ্ঞ আদালত শুনানি শেষে তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তিনি বলেন, মামলার অপর দু’আসামি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শাখার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস ও প্রভাতী শাখার প্রধান জিন্নাত আরাকে গ্রেফতারে সম্ভাব্যস্থানে তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানান ডিবি পুলিশের ওই কর্মকর্তা।

এর আগে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শাখার শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়ার বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) নাজনীন ফেরদৌসসহ তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় গত বুধবার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ তিন জনকে বরখাস্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে তাদের এমপিও বাতিল করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারী ঢাকা প্রতিদিনকে বলেন, গত ৩ ডিসেম্বর স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে তলব করায় ওইদিন আনুমানিক বেলা ১১টায় আমার স্ত্রী বিউটি অধিকারী ও মেয়ে অরিত্রী অধিকারীকে নিয়ে আমি স্কুলে যাই। সেখানে গিয়ে আমরা প্রথমে ক্লাস টিচার হাসনা হেনার কাছে যাই। তিনি আমাদের অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখেন এবং পরে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রভাতী শাখা প্রধান জিন্নাত আরা আক্তারের কাছে নিয়ে যান। তিনি আমাদের দেখেই উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং আমাদেরকে বলেন, আপনার মেয়েকে টিসি দিয়ে দেবো। তিনি রাগান্বিত অবস্থায় আছেন বুঝতে পেরে আমি তার কাছে ক্ষমা চাই। কিন্তু তিনি বলেন, আমার কিছু করার নেই। তখন আমরা অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) নাজনীন ফেরদৌসের সঙ্গে দেখা করতে যাই। আমার মেয়ে তার কাছে গিয়ে পা ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং মেয়ের ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা চিন্তা করে আমরাও ক্ষমা চাই। তারপর আমরা কেঁদে ফেলি। আমাদের বা অরিত্রীর কারো ক্ষমা প্রার্থনাই অধ্যক্ষের হৃদয় গলাতে পারেনি। পরে স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে যাই। পরে আমি আমার মেয়ে অরিত্রী অধিকারী ও স্ত্রী বিউটি অধিকারীকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে চলে যাই। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ফোন পেয়ে বাসায় ছুটে যাই। ততোক্ষণে সব স্বপ্নই শেষ হয়ে যায় বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন দিলীপ অধিকারী। কান্নাজড়িত কন্ঠে ঢাকা প্রতিদিনকে তিনি বলেন, বাসায় গিয়ে মেয়ে অরিত্রী অধিকারীকে তার পড়ার রুমের ফ্যানের সাথে গলায় ওড়না দিয়ে ফাঁস লাগানো অবস্থায় ঝুলতে দেখি। এরপর দ্রæত ফাঁস কেটে নিচে নামিয়ে নিথর দেহ দেখে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাই। সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার তার মেয়ে অরিত্রী অধিকারীকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, মেয়ের সামনে আমাকে ও আমার স্ত্রীকে স্কুলে ডেকে নিয়ে শাসানোর পরও নানাভাবে অপমান-অপদস্ত করার এমন অপমান সইতে না পেরে আমার মেয়ে অরিত্রী বাসায় ফিরে আত্মহত্যা করেছে। নিহতের মা-বাবা বলেন, স্কুল শিক্ষিকাদের এমন আচরণের কারণে আত্মহত্যার প্ররোচনায় আমাদের মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন দিলীপ অধিকারী দম্পতিসহ স্কুলের সহপাঠী ও অভিভাবকরা।

অরিত্রী অধিকারী আত্মহত্যার ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগ এনে দÐবিধির ৩০৫ ধারায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসসহ ৩ জনকে আসামি করে পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন অরিত্রী অধিকারীর বাবা দিলীপ অধিকারী। মামলার অপর দু’আসামি হচ্ছেন- স্কুলটির সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রভাতী শাখার প্রধান জিন্নাত আরা এবং শ্রেণি শিক্ষিকা হাসনা হেনা।

প্রসঙ্গত, গত ২ ডিসেম্বর রোববার অরিত্রী অধিকারী শ্রেণিকক্ষে তার পরীক্ষা চলাকালে মোবাইল ফোনে নকল করেছে- এমন অভিযোগে গত ৩ ডিসেম্বর সোমবার তার বাবা-মাকে স্কুলে ডেকে নিয়ে অপমান করেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস। তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার (টিসি) করা হবে বলেও তার মা-বাবাকে জানিয়ে দেন নাজনীন ফেরদৌস। শুধু তাই নয়, পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন বহন করার অভিযোগে অরিত্রীর সামনেই তার মা-বাবাকে শাসিয়ে নানাভাবে অপমান করা হয়। অরিত্রীর বাবা-মা এ ব্যাপারে অনেক অনুনয় বিনয় ও ক্ষমা চাইলেও মন গলেনি অধ্যক্ষের। পরে বাসায় ফিরে নিজ গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে না ফেরার দেশে পাড়ি দেয় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী। এ ঘটনার পর থেকে সহপাঠী-অভিভাবকদের চলমান আন্দোলনের মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই স্কুলের অধ্যক্ষসহ ৩ শিক্ষিকাকে বরখাস্তসহ তাদের এমপিও বাতিল করার নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য র‌্যাব-পুলিশকে চিঠি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

ঢাকা প্রতিদিন ডটকম/০৬ ডিসেম্বর/এসকে

Loading...

Check Also

শাই হোপের এই ব্যাটেই স্বপ্ন ভঙ্গ টাইগারদের

ক্রীড়া ডেস্ক, ঢাকা প্রতিদিন.কম ১২ ডিসেম্বর : এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ জয়ের স্বপ্ন ছিল ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *