Home / জাতীয় / ঢাকায় মাখনকে গ্রেফতার নিয়ে শেরপুরে ধুম্রজাল

ঢাকায় মাখনকে গ্রেফতার নিয়ে শেরপুরে ধুম্রজাল

শেরপুর প্রতিনিধি : রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে আব্দুল কুদ্দুছ মাখন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার নিয়ে শেরপুরে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশের ভুমিকা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতাসীন দু’গ্রুপের বিরোধের জের ধরে পুলিশ তাকে সাজানো মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে নানা টালবাহানা শুরু করেছে। তবে পুলিশ বলছে, তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেফতারের পর মাদকদ্রব্য ও জালনোট উদ্ধার করা হয়েছে। এদিকে মাখনের পরিবার বিষয়টি স্থানীয় ও দলের শীর্ষ নেতাদের অবহিত করলে ঘটনাটি দেখবেন বলে তার পরিবারকে আশ্বস্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, আব্দুল কুদ্দুছ মাখন ঘর ভাড়া নিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় বসবাস করেন। গত ৫ অক্টোবর শেরপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মোহাম্মদপুরের ভাড়া বাসা থেকে মাখনকে তুলে নিয়ে যায়। পরদিন বিকেল ৪টায় তাকে শেরপুর ডিবি অফিসে এনে আটক রাখা হয়। এরপর খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা শেরপুর ডিবি অফিসে ছুটে যান। এবং তাকে গ্রেফতার করার কারণ জানতে চান। কিন্তু তাৎক্ষণিক পুলিশ কোন সদোত্তর দিতে পারেনি। বরং সেখানে দিনভর ডিবি’র ওসি নওজেস, সদর সার্কেলের এডিশনাল এসপি, এসপি পরস্পরবিরোধি বক্তব্য দিতে থাকেন। ময়মনসিংহ রেঞ্জ ডিআইজি নিবাস চন্দ্র্র মাঝিও মাখনকে গ্রেফতারের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য দিতে পারেননি। এরপর ওইদিন রাত ৮টায় ভিকটিমের ছোটভাই দু’জন আইনজীবীকে সাথে নিয়ে শেরপুর ডিবি অফিসে যান। কিন্তু ডিবি’র ওসি নওজেস ডিবি হেফাজতে আটক মাখনের সাথে দেখা করতে দেননি। তবে তাদের এসপির সাথে দেখা করে এ ব্যাপারে কথা বলার অনুরোধ করেন। এবং তাদের সাফ জানিয়ে দেন, স্থানীয় কতিপয় নেতাদের সাথে চলমান দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলুন। এরপর তারা পুলিশ সুপারের সাথে দেখা করলে মাখনের বিষয়ে কোন কথা বলতে চাননি। বরং আজ নয়, কাল বলে নানা টালবাহানা শুরু করেন।

পরে ওইদিন রাত সাড়ে ৯টায় পুলিশ মাখনকে নকলা থানার চরবসন্তি গ্রামে নিয়ে যায়। সেখানে জনৈক আলী হোসেনের পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে ১০ বোতল ফেন্সিডিল ও সাড়ে ১৫ হাজার টাকার জালনোট উদ্ধার দেখায় পুলিশ। এরপর পুলিশ মাখনকে শেরপুর সদর থানার দায়ের করা ১৪ আগস্টের এক মামলায় (মামলা নং-২৩, ধারা- ১৯৭৪ সনের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫-ক(খ)) তদন্তে প্রাপ্ত সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ঢাকা হতে গ্রেফতার দেখায়। পরে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার দেয়া তথ্যে উক্ত আলামত উদ্ধার করা হয় বলে পুলিশ তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করে।

এ প্রসঙ্গে মাখনের আইনজীবী মকবুল হোসেন সরকার বলেন, আসামিকে (মাখন) যে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, সে মামলায় আদালতে সোপর্দ করার আগে অন্যকোন মামলায় জড়ানোর আইনি কোন বিধান নেই। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাকে এ মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। স্বজনদের দাবী, আব্দুল কুদ্দুস মাখনকে ৬ অক্টোবর দু’টি মামলায় শেরপুর আদালতে সোপর্দ করা হয়। নকলা থানার মামলা নং- ৫(১০/২০১৮) মূলে তাকে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত ৭ অক্টোবর রিমান্ডের শুনানির দিন ধার্য করে আসামিকে জেলহাজতে প্রেরণ করেন। পরদিন আসামির উপস্থিতিতে উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ৩ দিনের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দেন। কিন্তু সম্পূর্ন বেআইনিভাবে পরদিন ৮ অক্টোবর পূনরায় আসামীর ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আসামিকে দুপুর ২টায় জেলখানা থেকে আদালতে আনা হয়। এবং তাকে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। যা সম্পূর্ন আইনের পরিপন্থি।
এ প্রসঙ্গে মাখনের আইনজীবীরা বলেন, এ ধরণের আদেশ একটি নজিরবিহীন ঘটনা। নির্দেশনার পর বিচারক বিব্রত বোধ করে এজলাস থেকে নেমে যান বলেও মাখনের আইনজীবীরা জানান। সুপ্রীম কোর্টের ব্লাস্ট বনাম রাষ্ট্র রিমান্ড সম্পর্কিত একটি মামলার রায়ে বলা আছে- কোন আসামিকে ৩ দিনের অধিক রিমান্ড দেয়া যাবে না। এবং ডাক্তারি পরীক্ষা করে একজন আইনজীবী বা আসামীর আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতিতে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। পরদিন ৯ অক্টোবর ভোর বেলায় কোন আইনের তোয়াক্কা না করে সকাল ৯টায় আসামিকে জেলগেট থেকে ডিবি অফিসে নিয়ে আসা হয়। আসামির সাথে এখন পর্যন্ত তার কোন আইনজীবী বা আত্মীয় স্বজনকে দেখা করার সুযোগ দেয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে পুলিশ সুপারের সাথে ৪ জন আইনজীবী ও আসামির ভাই এবং একজন সাংবাদিক সাক্ষাৎ করতে গেলে এসপি বলেন, ডিবি অফিসে গিয়ে দেখা করে যান। কিন্তু ডিবির ওসি তাদেরকে আসামির সাথে দেখা করতে দেননি। পরবর্তীতে পুলিশ সুপারকে মোবাইলে বিষয়টি জানালে তিনি মোবাইল কেটে দেন।

শুধু মামলা নয়, মাখনের সামনে মাদক ও জাল টাকা দিয়ে ছবি তুলে গণমাধ্যমে ছেড়ে দেয়া হয়। মাখন থাকেন ঢাকা শহরে, আর জাল টাকা ও ফেন্সিডিল উদ্ধার করলেন নকলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে। গ্রেফতারের পর থেকে মাখনের পরিবারের দাবি, মাখন শেরপুরে আওয়ামী লীগের বিবাদমান গ্রুপিংয়ের শিকার। ক্ষমতাধর এক মন্ত্রীর বিরোধী গ্রুপের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে পুলিশ দিয়ে সাজানো মামলায় ফাঁসানোর ব্যবস্থা করা হয়। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী গ্রুপের কিছু সংখ্যক লোক মাখনের ছবিকে এডিট করে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। এতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। মাখনের পরিবারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক, জাতীয় সংসদের হুইপ আতিকুর রহমান আতিক, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সহসভাপতি বদিউজ্জামান বাদশা, ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুলের স্মরণাপন্ন হলে তারা বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে অবহিত করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি দেখবেন বলে মাখনের পরিবারকে আশ্বস্ত করেন।
আইনজীবীরা জানান, শেরপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিমান্ড সম্পর্কিত একটি রিভিশন মামলার নিস্পত্তি করলেন বিচক্ষণতার মাধ্যমে। আব্দুল কুদ্দুছ মাখনকে বেআইনীভাবে দেয়া পাঁচ দিনের রিমান্ডকে চ্যালেঞ্জ করে এই রিভিশন করেন ময়মনসিংহ জেলা বারের সিনিয়র আইনজীবী এড. পিযুষ কান্তি সরকার। শুনানি শেষে আদালত মামলার আইওকে বলেন পাঁচ দিনের রিমান্ড নেয়া এবং দেয়া দু’টিই বেআইনি হয়েছে। সুতরাং আইনি জটিলতা এড়াতে মাখনকে সংশ্লিষ্ট আদালতে ফেরত দিন। মামলার আইও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারে সাথে কথা বলে মাখনকে আমলি আদালতে প্রতিবেদনসহ সোপর্দ করলে মাখনের আইনজীবী রিভিউ আবেদনটি নটপ্রেস করেন।

ঢাকা প্রতিদিন ডটকম/১৩ অক্টোবর/এসকে

Loading...

Check Also

অগ্নিদগ্ধ সাগরও মারা গেলো

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর উত্তরখানে লিকেজ গ্যাস লাইন থেকে লাগা অগ্নিকাণ্ডে মারাত্মক দগ্ধ সাগরও (১২) ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *