Home / অর্থ-বাণিজ্য / পোলট্রি খাতে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কশাঘাত

পোলট্রি খাতে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কশাঘাত

অর্থনীতি ডেস্ক, ঢাকা প্রতিদিন.কম ১৭ সেপ্টেম্বর : ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কশাঘাতে জর্জরিত পোলট্রি খাত। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে লোকসানে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক খামার। এ খাতে ৮ শতাংশ সুদহারে ঋণ দেয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সুদ গুনতে হচ্ছে ১২ শতাংশের বেশি। ফলে এ খাতে নতুন বিনিয়োগ আসছে না।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পোলট্রি খাতে ঋণের উচ্চ সুদের নেতিবাচক প্রভাবের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, ঋণের উচ্চ সুদহার বজায় রাখায় পোলট্রি ফার্মসহ ক্ষুদ্র অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অথচ প্রতিটি ব্যাংক বছরে ১৫০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা মুনাফা করছে। এ বিষয়ে কমিটির পরবর্তী বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়।

জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ঋণের উচ্চ সুদহার পোলট্রি শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ খাতের অবস্থা খুবই খারাপ। আগে ব্যাংকগুলো পোলট্রি খামারিদের ৮ শতাংশ সুদহারে ঋণ দিত। এখন সুদের হার বাড়িয়ে ১২ শতাংশ করেছে। এতে উদ্যোক্তারা বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে। অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২১ সালের মধ্যে দেশের জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি পিস ডিম এবং সাড়ে ৫ হাজার টন মুরগির মাংসের প্রয়োজন হবে। বিপুল এ চাহিদা পূরণে পোলট্রি খাতে বিনিয়োগ দরকার হবে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা। ঋণের সুদহার না কমলে নতুন উদ্যোক্তারা এ খাতে বিনিয়োগ করবেন না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলো কমপক্ষে ৫০টি পোলট্রি খামারকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। অপরাধ ঋণ শোধ করতে না পারা। কিন্তু কালো তালিকাভুক্ত খামার কোম্পানিগুলো উচ্চ সুদের কারণেই লোকসানের মুখে পড়েছে।

বিপিআইসির সাধারণ সম্পাদক মো. আহসানুজ্জামান জানিয়েছেন, পোলট্রিতে সুদের হার ১০ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়েছে। এ খাতে ব্যাংকগুলো এখন আর স্বল্প সুদে ঋণ দিচ্ছে না। ফিড মিল করতে কেউ ব্যাংক ঋণও পাচ্ছে না। এটি এক ধরনের বিনিয়োগের অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দশম জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে কৃষি ফসলের মতো পোলট্রি খাতের জন্যও ব্যাংক ঋণের সুদহার ৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়।

এছাড়া চতুর্থ বৈঠকে এ খাতে ভর্তুকি বা স্বল্প সুদে ঋণ সহায়তা দেয়া যায় কি না, তা বিচার-বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। পোলট্রি শিল্পে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ আছে। কিন্তু অনেক ব্যাংক এ খাতে ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। ছোট খামারিরা ঋণ চেয়েও পান না।

ঋণ পাওয়ার সমস্যা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ষষ্ঠ বৈঠকে ফের আলোচনা হয়। ওই বৈঠক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পোলট্রি খাতে ঋণের পরিমাণ জানতে চাওয়া হয়।

বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক কী পরিমাণ ঋণ দিয়েছে, কত সুদে দেয়া হয়েছে, এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন পেশ করতে বলা হয়। এরপর আর এ উদ্যোগের অগ্রগতি নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, পোলট্রি শিল্পে ব্যাংক ঋণের সুবিধা আছে। সব ব্যাংকে ঋণ দেয়ার নির্দেশনা আছে।

বিপিআইসির তথ্যমতে, বর্তমানে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার পোলট্রি খামার আছে। সবচেয়ে বেশি গাজীপুরে। ২০০৭ সালে সেখানে প্রায় ৮ হাজার খামার থাকলেও বর্তমানে সাড়ে ৫ হাজার আছে। বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে ছোটখাটো অনেক খামার।

ওই জেলার কালিয়াকৈরের বিদেশফেরত মহিউদ্দিন মিয়া জানান, ঋণ সুবিধা না পাওয়ায় পোলট্রি ফার্ম ব্যবসা এগোতে পারছেন না। অপরদিকে এ খাতে বিনিয়োগের জন্য বিদেশি কোম্পানিগুলো ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদহারে ঋণ পাচ্ছে।

যশোরের কড়িয়াখালীর শাহাবুদ্দীন বলেন, ব্যাংকে বিভিন্ন সময় আবেদন করেও ঋণ পাইনি। তাই ডিলারদের কাছ থেকে বাকিতে বেশি দামে মুরগির বাচ্চা, খাবার ও মেডিসিন কিনতে বাধ্য হয়েছিলাম। এতে লোকসানের মুখে পড়ে ফার্ম বন্ধ করতে হয়েছে।

একই গ্রামের মনসুর আলী বলেন, অনেক স্বপ্ন নিয়ে খামার করেছিলাম। কিন্তু এনজিও থেকে বেশি সুদে ঋণ নিয়ে টিকতে পারিনি। খামার বন্ধ করে দিয়ে এখন কাঁচামালের ব্যবসা করছি।

এ প্রসঙ্গে ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ শাখার (ওয়াপসা) সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ বলেন, এ খাতে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ সুবিধা থাকলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা সে সুবিধা পান না। তাদের ঋণ সুবিধা কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ। প্রান্তিক ও মাঝারি খামারিরা ব্যাংক ঋণ না পেয়ে ডিলারদের কাছ থেকে বাকিতে বাচ্চা, খাবার ও ওষুধ কিনছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, পোলট্রি একটি শিল্প খাত। অনেকে কর্মসংস্থান হিসেবে এ খাত বেছে নিয়েছেন। এ খাতকে এগিয়ে নিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের জন্য স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।

ঢাকা প্রতিদিন.কম/এআর

Loading...

Check Also

ঘরেই পরীক্ষা করুন দাঁতের ক্ষয়

লাইফস্টাইল ডেস্ক, ঢাকা প্রতিদিন.কম ২২ অক্টোবর : দাঁতে ক্যারিজ বা ক্ষয়, গর্ত এসব কিন্তু মানুষের ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *