Home / জাতীয় / প্রয়াত সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলীর ৩য় মৃত্যুবার্ষিকী কাল

প্রয়াত সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলীর ৩য় মৃত্যুবার্ষিকী কাল

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রয়াত সমাজকল্যাণমন্ত্রী, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসিন আলীর ৩য় মৃত্যুবার্ষিকী পারিবারিক ও দলীয়ভাবে পালিত হবে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, আগামীকাল শুক্রবার সকালে সৈয়দ শাহ মোস্তফা (র.) মাজার প্রাঙ্গণে সৈয়দ মহসীন আলীর কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন পরিবারে সদস্য, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

এ ছাড়া বিভিন্ন মসজিদে দোয়া ও মন্দিরে প্রার্থনা করা হবে। পরিবারের উদ্যোগে দর্জির মহল নিজ বাস ভবনে কুরআন তেলাওয়াত, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ মাহফিল ও শিরণী বিতরণের অয়োজন করা হবে।
নিজের শ্রম, মেধা, উদার মানবিকতা, বিচক্ষণ রাজনৈতিক চিন্তাশক্তি, তুখোড় দেশ প্রেম ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে যিনি দেশের মাটি ও মানুষের মাঝে মিশে আছেন তিনিই সৈয়দ মহসিন আলী। জীবদ্দশায় পুরোটা সময় তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের প্রতিটা জনপদে সাধারণ মানুষের মাঝে। নিজের সমস্ত অর্থ-সম্পদ মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতে পছন্দ করতেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবনপণ সংগ্রামেই দেশের স্বাধীনতার রক্তিম আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। স্পষ্ট ও বস্তুনিষ্ট বক্তব্যের কারণে তিনি ছিলেন সমালোচিত এক বীর পুরুষ। ১৯৪৮ সালের ১২ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের এক স¤্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

ছাত্রলীগের একজন সদস্য হিসেবে মহসীন আলী ছাত্রজীবনেই আওয়ামী লীগ রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। ১৯৭১ এর ২৩ বছর বয়সে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত মহকুমা জেলা রেডক্রিসেন্ট এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়ত্বি পালন করেন। তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবেও নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মৌলভীবাজার চেম্বারের সভাপতি এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক এর দায়ত্বিও পালন করেন।

সৈয়দ মহসিন আলী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত এবং আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়ত্বি পালন করছেন। তিনি ১৯৮৪ সালে থেকে পরপর তিনবার মৌলভীবাজার পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি চেয়ারম্যান থাকাকালে স্থানীয় সরকারের আওতায় বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নেন। তিনি থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে পরিবার পরিকল্পনা এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বষিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯২ সালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে শ্রেষ্ঠ পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন, ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মৌলভীবাজার জেলা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়ত্বি পালন করেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়ত্বি পালন করেন।
২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩৭-মৌলভীবাজার-৩ আসন হতে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ১২ জানুয়ারি ২০১৪ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। মৃত্যুও আগ পর্যন্ত তিনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়রে মন্ত্রী হিসেবে দায়ত্বি পালন করেন।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ সরকার স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে। ২০১৫ সালে সৈয়দ মহসিন আলী ভারতের আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন রিসার্চ সোসাইটির কাছ থেকে ‘আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন স্মৃতি স্বর্ণপদক-২০১৪’ লাভ করেন এবং ‘হ্যালো কলকাতা’ নামে কলকাতাভিত্তিক একটি সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠান তাকে ‘নেহেরু সাম্য সম্মাননা-২০১৪’ পুরস্কারে ভূষিত করে। শেষ সময়ে এসে মহসীন আলী নিউমোনিয়া, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের সমস্যায় ভুগছিলেন । ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

আমৃত্যু তিনি জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত থেকে গণমানুষের সেবাই নিজকে উৎসর্গ করেছিলেন। ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনে এবং ১৯৬৯- এর গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু মৌলভীবাজার সফরে গেলে ছাত্রলীগের পক্ষে ব্যতিক্রমী তোরণ নির্মাণ করে তিনি জাতির জনকের নজর কাড়েন। সিংহ হৃদয়ের মহসীনকে চিনতে ভুল করেননি বঙ্গবন্ধু, তিনি তাকে কাছে টেনে নেন পরম মায়ায়। কোন প্রলোভন সৈয়দ মহসিন আলীকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। যখন দেশের অনেক বড় বড় নেতা নীতি ও আদর্শ বিসর্জন দিয়ে বাজারের পন্যের মতো বিক্রি হয়েছেন সে অবস্থা ও সময়কে তিনি পায়ে মাড়াতে সাহস দেখিয়েছেন। বরং নিজের বাপ-দাদার সম্পত্তি বিক্রি করে রাজনীতি করে গেছেন। আজকের যুগে তার মতো এমন নির্লোভ, নির্মোহ, সৎ ও দেশপ্রেমিক নেতা পাওয়া বিরল।

সৈয়দ মহসিন আলী শুধু একজন জননেতাই ছিলেন না তিনি ছিলেন শিল্প-সাহিত্যের প্রতি বিশেষ অনুরাগী। ধ্রুপদী, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরণের গানই তার মুখস্ত ছিলো। তার স্মৃতিতে প্রায় ৫ হাজার গানের সংগ্রহ ছিলো। সমাজকল্যাণে তার প্রিয় সংগীত ছিলো ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ অথবা ‘আমরা করবো জয়’। এক কথায় বলতে গেলে সৈয়দ মহসিন আলী ছিলেন একজন স্বভাবশিল্পী। এ কারণেই তিনি বিভিন্ন সাহিত্য-সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় নিঃসংকোচে তার উদার হাত প্রসারিত রাখতেন। সাহিত্য ও সাংবাদিকতা ছিলো তার পছন্দের বিষয়। অবসরে তিনি বই পড়তে ভালবাসতেন। কবি-লেখকদের সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা দিতেন। দেশের বড় বড় সাংবাদিকদের অনেকেই ছিলেন তার ব্যক্তিগত বন্ধু।

তিনি এক সময় বাংলাদেশ টাইমসের প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় ছিল, যে সাংবাদিকদের তিনি সব সময় সম্মান করতেন, এবং তাদের যথাযোগ্য মর্যাদা দিতেন সেই সাংবাদিকদের একটা অংশ সমাজকল্যাণ মন্ত্রী থাকা অবস্থায় সৈয়দ মহসিন আলীর উদার ও সহজ-সরল জীবনের বিশেষ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়া বা যেততেন বিষয় নিয়ে তাকে বিভিন্নভাবে নাজেহাল করেছেন। কিন্তু এসবে ভ্রুক্ষেপ না করে সৈয়দ মহসিন আলী তার নিজের কাজটি করে গেছেন। তার সততা নিয়ে চরম শত্রুও কোনদিন কোনো প্রশ্ন তুলতে পারেনি। ব্যক্তি চরিত্রে সারল্যতা, দেশ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাকে করেছিল অন্যদের চেয়ে করেছিল আলাদা। তিনি যেমন সাদাকে সাদা বলতেন তেমনি কালোকে কালো বলতে দ্বিধান্বিত ছিলেন না। ভন্ডামী, অসাধুতা, হটকারীতাকে তিনি ঘৃণা করে গেছেন আজীবন।

সৈয়দ মহসিন আলী ছিলেন, মৃত্তিকার সন্তান, মাটি, মানুষের বরপুত্র ও বরেণ্য রাজনীতিক। কাজেই শারীরিক মৃত্যু হলেও তার আত্মা ও আদর্শের মৃত্যু হয়নি। তার আদর্শ অম্লান অমলিন। তিনি তার কর্মের জন্য চিরদিন বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ের অন্তরের মণিকোঠায়। সৈয়দ মহসীন আলীর মহাপ্রয়াণের ৩য় বর্ষপূর্তিতে আমরা কেউ ভাবতেই পারছিনা, সৈয়দ মহসিন আলী আমাদের মাঝে নেই। তবু তিনি আছেন, এবং থাকবেন আমাদের মাঝে হয়তো স্বশরীরে নয়, থাকবেন অন্য চেতনায়, অন্য অবয়বে।

ঢাকা প্রতিদিন ডটকম/১৩ সেপ্টেম্বর/এসকে

Loading...

Check Also

আর গণগ্রেফতার নয়, পুলিশকে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র বাছাইয়ের নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: এবার নতুন করে আর কোন গণগ্রেফতার নয়, পুলিশকে নতুন কোনো রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতার ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *