Home / জেলার খবর / ‘আমরা কাঠুরে না, স্কুলে পড়ি’

‘আমরা কাঠুরে না, স্কুলে পড়ি’

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি : আমরা কাঠুরে না, স্কুলে পড়ি। এই মাত্র আমাগো ক্লাস শেষ হইছে। ঘরে রান্দার (রান্না) দাউর (লাকড়ি) নাই। বৃষ্টিতে সব ভিইজ্যা গ্যাছে। রাতে তো রান্দা লাগবে তাই মায় কইছে সন্ধ্যার আগে জঙ্গল দিয়া কিছু দাউর আনতে। তাই আমরা এই জঙ্গলে আইছি কয়ডা হুগনা (শুকনো) ডাল নেওয়ার লাইগ্যা। জঙ্গলে ভেঙ্গে পড়া গাছের ডাল,পাতা কুড়াতে কুড়াতে এ সরল স্বীকারোক্তি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মো. সানাউলের।

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ধুলাসার ইউনিয়নের সাগর ঘেষা দক্ষিণ কাউয়ার চর বনাঞ্চলে আজ শেষ বিকালে এ দৃশ্য চোখে পড়ে। এ স্কুল শিক্ষার্থীর সাথে কাঠ কুড়াতে ব্যস্ত আলমগীর, তাইজুল, রফিকুল ও শিশু শিক্ষার্থী শাহীন। তাদের বাড়ি দক্ষিণ কাউয়ার চর গ্রামে এবং সবাই স্কুল শিক্ষার্থী।

কলাপাড়া উপজেলা সদর থেকে আন্ধারমানিক নদ পেড়িয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে দূর্য়োগ কবলিত ইউনিয়ন ধুলাসার। এ ইউনিয়নের সাগর ঘেষা গ্রামের নাম দক্ষিণ কাউয়ার চর। ১১ বছর আগে প্রাকৃতিক দূর্যোগে এই গ্রামটি সাগরের জলোচ্ছাসে বালুচাপা পড়লেও সদ্য সৃষ্টি করা বনাঞ্চল এখন গ্রামটিকে সবুজে ঢেকে দিয়েছে। যে গ্রামে একযুগ আগেও শতকারা ৮০ ভাগ শিশু-কিশোর স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে পারিবারিক অস্বচ্ছলতায় মাছ ধরাসহ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম পেশায় নিয়োজিত ছিলো, সেই গ্রামের প্রায় ৯০ ভাগ শিশু-কিশোর এখন স্কুলে যায়।

জঙ্গলে কাঠ কুড়াতে কুড়াতে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র সানাউল জানায়, দূরের এই ফ্রেন্ডশীপ স্কুল, চরচাপলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধুলাসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধুলাসার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এই গ্রামের অনেকে পড়ে। সবাইতো (ছাত্র-ছাত্রী) স্কুল ছুটির পর কাজ করে। আমরাও করছি। ঘরে আব্বায় নাই, মাছ ধরতে সাগরে গ্যাছে। কিন্তু রান্দা তো লাগবে, হেইয়ার লাইগ্যা এইহানে আইছি লাকড়ি টোকাইতে।

শিশু শিক্ষার্থী শাহীনের বয়স সবে সাত। প্রথম শ্রেণির ছাত্র। জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়াতে দেখলে মনে হবে সে কর্মঠ যুবক। শুকনো চিকন ডাল ভেঙ্গে ভেঙ্গে সে এক জায়গায় স্তুপ করছে। মাত্র ১০-১৫ মিনিটে সে এক পাঁজা কাঠ সংগ্রহ করেছে। শাহীন জানায়, স্কুলে যাই, খেলি আবার কাজও করি। মাঝে মাঝে ট্রলারে যাই চাচার লগে। মাছ ধরাও শিখি।

অপর স্কুলছাত্র আলমগীর ও রফিকুল জানায়, বর্ষায় বাড়ির মধ্যে পানি জইম্মাা থাহায় যে লাকড়ি, শুকনা পাতা আছিলো সব ভিইজ্যা গেছে। জঙ্গলের মধ্যে উঁচু। পানি জমে না। তাই এইহান দিয়া আমরা সময় পাইলে লাকড়ি নিয়া যাই বাসায়। তাদের মতো প্রতিদিন দিন-রাতে অন্তত অর্ধশত স্কুল-পড়–য়া শিশু-কিশোর সাগর তীর ঘেঁষা এ বনাঞ্চলে কাঠ সংগ্রহ করছে। কেউবা মাছ ধরাসহ অন্য কাজও করছে স্কুল ছুটির অবসরে।

স্থানীয় বশির মিয়া জানালেন, এইহানের (কাউয়ারচর গ্রাম) মানুষ বাইচ্চাই আছে সাগর ও জঙ্গলের উপর নির্ভর করে। সাগরে মাছ শিকার না করলে খাওন জোটে না, আবার জঙ্গল না থাকলে মানুষ ঝড়,জলোচ্ছাসে ভাইস্যা যাইতো। এই জঙ্গলই আমাগো বাচাইয়া রাখছে। তবে স্বীকার করলেন, জঙ্গল থেকে এভাবে কাঠ সংগ্রহ কিংবা গাছ মেরে ফেলা ঠিক না।

শিক্ষিকা হোসনে আরা ইয়াসমিন জানান, কয়েক বছর আগে এ গ্রামের ৩-৪ কিলোমিটারের মধ্যেও কোন স্কুল ছিলো না। তাই শিক্ষার হার কম ছিলো। এখন গ্রামের অধিকাংশ শিশু স্কুলে যায়। তবে পরিবারের কাজে স্কুল ছুটির পর শিশুরা অনেকটা সময় ব্যয় করছে বলে জানালেন। সেটা পরিবারের স্বার্থে হওয়ায় তারাও উৎসাহ যোগাচ্ছেন। তবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার জন্য তারা অভিভাবক ও শিশুদের নিরুসাৎহিত করছেন।

ঢাকা প্রতিদিন ডটকম/১০ জুলাই/এসকে

Loading...

Check Also

হবিগঞ্জে ভোটযুদ্ধে ২২ প্রার্থী

তবারক এ লস্কর, হবিগঞ্জ থেকে : হবিগঞ্জের ৪টি আসনে চ‚ড়ান্তভাবে ভোটযুদ্ধে রয়েছে ২২ প্রার্থী। তারা ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *