Home / জাতীয় / যাকাত আনতে গিয়ে সারা দেশে ৩৮ বছরে ১৭০ জনের প্রাণহানি

যাকাত আনতে গিয়ে সারা দেশে ৩৮ বছরে ১৭০ জনের প্রাণহানি

# যাকাত দিতে পুলিশের অনুমতি লাগবে
# লোক সমাগমস্থল উন্মুক্ত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
# যাকাত গ্রহনেচ্ছুকদের ঝুঁকি না নেয়ার আহ্বান
# লোক জড়ো করে যাকাত দেয়া ইসলাম সমর্থন করে না
# পুলিশি সহায়তায় নিয়ম মেনে যাকাত দিতে হবে

এসএম দেলোয়ার হোসেন, ঢাকা : যাকাত বা অন্য নামে বিতরণ করা কাপড়সহ অন্যান্য পণ্য সামগ্রী আনতে গিয়ে প্রতিবছরই হুড়োহুড়িতে দেশের কোথাও না কোথাও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হলেও এখনো যাকাত বিতরণের ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলা মানা হচ্ছে না। ফলে কোনো মতেই হতাহতের ঘটনা ঠেকানো যাচ্ছে না। গত ৩৮ বছরে সারাদেশে এ পর্যন্ত অন্তত ১৭০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। নারী-শিশুসহ আহত হয়েছে আরো অন্তত ১ হাজার মানুষ। এর সবগুলো ঘটনাই ঘটেছে ঈদুল ফিতরকে ঘিরে পবিত্র রমজান মাসে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, যাকাত প্রদানের নামে এভাবে কাপড় বিতরণ করার বিষয়টি ইসলাম কোনো মতেই সমর্থন করে না। বিগত বছরগুলোর মত সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র রমজান শুরুর আগেই এবার বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কবির স্টিল মিলস লিমিটেড (কেএসআরএম) এর উদ্যোগ ইফতার সামগ্রী বিতরণের সময় ঘটেছে প্রাণহানির ভয়াবহ ঘটনা। গত ১৪ মে পদদলিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ইফতার সামগ্রী আনতে যাওয়া হতভাগিনী ৯ জন নারী। আহত হয়েছেন আরো অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোর। বিগত বছরের রমজান মাসের বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, ঈদুল-ফিতরের আগে রমজান মাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থান থেকে বিতরণ করা কাপড়সহ ইফতার সামগ্রী আনতে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে হুড়োহুড়িতে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলো নারী-শিশু।

মানবাধিকার কমিশন বলছে, এবার নির্বাচনের বছর হওয়ায় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে হতদরিদ্রদের মাঝে ঈদে সহায়তা বিতরণের প্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম ট্র্যাজেডির বিষয়টি মাথায় রেখে প্রাণহানি ঠেকাতে বিতরণকারী ও প্রশাসনকে আগেভাগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার। পুলিশ বলছে, যাকাত প্রদানের আগে পুলিশকে জানালে সুষ্ঠুভাবে তা সম্পন্ন ও হতাহত রোধ করা সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৮ সালের ১৫ মে পর্যন্ত গত ৩৮ বছরে সারা দেশে যাকাত বিতরণকালে পদদলিত হয়ে অন্তত ১শ’ ৭০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। নারী-শিশুসহ আহত হয়েছে আরো অন্তত ১ হাজার মানুষ।

সূত্র জানায়, ১৯৮০ সালে ঢাকার জুরাইনে যাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার ৩ বছর পর ১৯৮৩ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যাকাতের টাকা আনতে গিয়ে ভিড়ের চাপে পড়ে মারা যায় ৩ শিশু। ১৯৮৭ সালের ২৩ মে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় সরকারিভাবে যাকাত দেয়ার সময় ব্যাপক লোক সমাগম হয়। সেখানে জনগণ উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে ৪ জন মারা যায়। ১৯৮৯ সালের ৫ মে চাঁদপুরে জাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে পদদলিত মারা যায় ১৪ জন। এসময় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়। ১৯৯০ সালের ২৬ এপ্রিল চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর আবুল বিড়ি ফ্যাক্টরিতে যাকাত আনতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মারা যান ৩৫ জন। এসময় আহত হয় আরো অন্তত দুই শতাধিক মানুষ। ১৯৯১ সালে ১৩ এপ্রিল পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডে যাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে মারা যান ২ জন। ২০০৫ সালে গাইবান্ধা নাহিদ ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানে যাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে নিহত হন ৩৭ জন। ২০০৫ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রামে কেএসআরএম মালিকের বাড়িতেই জাকাত আনতে গিয়ে প্রাণ হারায় ৮ জন। ২০১৪ সালের ২৫ জুলাই মানিকগঞ্জে সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ হাসান রুনুর বাড়িতে যাকাত আনতে গিয়ে তিন জনের মৃত্যু হয়।

এ ঘটনার পরের দিন ২৬ জুলাই বরিশালে খান অ্যান্ড সন্স গ্রুপের মালিকের বাসভবনে জাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে প্রাণ হারায় ২২ জন। একই দিন বরিশালের কাঠপট্টি এলাকায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে জাকাত আনতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ২ নারীর মৃত্যু ঘটে। ২০১৫ সালের ১০ জুলাই ময়মনসিংহে নূরানি জর্দা ফ্যাক্টরিতে যাকাতের কাপড় বিতরণের সময় পদদলিত হয়ে ২৭ জনের মৃত্যু হয়।

সর্বশেষ চলতি বছরের গত ১৪ মে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় কবির স্টিল মিলস লিমিটেড (কেএসআরএম) এর উদ্যোগ দুস্থদের মাঝে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করা হয়। সেখানে হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে ৯ নারীর প্রাণহানি ঘটে। এ ঘটনায় আহত হন আরো অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ।

এমন মৃত্যুর ঘটনার পরদিন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ বলেছে, রমজানে অনুমতি ছাড়া ইফতার সামগ্রী, যাকাত-সদকা বিতরণ করা যাবে না। গত ১৫ মে বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মাসুদ উল হাসান। তিনি জানান, গরীব মানুষের জীবন নিয়ে তামাশা বন্ধ করতেই এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

মাসুদ উল হাসান জানান, যারা গণহারে হাজার হাজার গরীব লোক জড়ো করে যাকাত, সদকা, ইফতার বিতরণ করছেন তাদের এভাবে যাকাত, সদকা ও ইফতার সামগ্রী বিতরণ করাকে নিরুৎসাহিত করছে পুলিশ প্রশাসন। যারা এভাবে যাকাত-সদকা প্রদান করতে চান তাদের আগেভাগেই অনুষ্ঠান আয়োজনের আগে সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রধানের কাছে লিখিতভাবে অনুমতির জন্য আবেদন করতে হবে। এরপর ওই আবেদনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। আবেদনের বিষয়গুলো গ্রহনযোগ্য হলে সংশ্লিষ্টদের অনুমতি দেয়া হবে। প্রয়োজনে পুলিশও সহযোগিতা দেবে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানায়, যাকাত বা ঈদের সহায়তার নামে এভাবে কাপড় বা অন্য কিছু বিতরণ ইসলাম সম্মত নয়। এভাবে লোকদের ডেকে এনে সহায়তা দেয়ার পেছনে নাম প্রচারের আকাক্সক্ষা রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে,যাকাত আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে পদদলিত হয়ে এসব মৃত্যুর ঘটনায় কাউকে অদ্যবধি সাজা ভোগ করতে হয়নি।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুহাদ্দিস মাওলানা ওয়ালিউর রহমান খান আজহারী ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, জাকাতের নামে এভাবে কাপড় বিতরণ কোনোভাবেই ইসলাম ধর্ম সমর্থন বা অনুমোদন করে না। ইসলামে দুই ভাবে জাকাত প্রদানের কথা বলা হয়েছে। একটি রাষ্ট্র ধনীদের কাছ থেকে জাকাত সামগ্রী সংগ্রহ করে তা বিতরণ করবে। আর দ্বিতীয়টি, ব্যক্তি উদ্যোগে বিতরণ। এ ক্ষেত্রে এমনভাবে জাকাত দিতে হবে যেন একজন মানুষ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তার অভাব অনটন যেন দূর হয়। কিন্তু একটি কাপড় বা লুঙ্গি শতশত মানুষকে দেয়া সেটা নাম ফোটানো মাত্র। তাছাড়া অন্যকিছু হতে পারে না। আর সেই জাকাত কতটা বস্তুনিষ্ঠ হবে সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানায়, ইসলামের বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণমুক্ত সাড়ে ৫৩ তোলা রূপা বা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা তার সমমূল্যের ব্যবসায়ী সম্পদ বা টাকা পয়সা থাকলে তার ওপর জাকাত ফরজ। এর বেশি যত সম্পদ থাকবে তার আড়াই শতাংশ জাকাত হিসেবে বিতরণ করতে হয়। রোজায় বিতরণ করলে পূণ্য বেশি হয়, এমন বিশ্বাস থেকেই ঈদের আগেই জাকাত বিতরণের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আবার এই জাকাত বিতরণ করতে গিয়েই প্রায়ই পদদলিত হয়ে প্রাণহানির মত ঘটনা ঘটছে।

এদিকে যাকাতের বিষয়ে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, এবার নির্বাচনের বছর হওয়ায় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নিজেদের যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে জাহির করতে হতদরিদ্র দুস্থদের মাঝে ঈদে সহায়তা বিতরণের প্রবণতা বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এমন আশঙ্কাই রয়েছে। তাই চট্টগ্রাম ট্র্যাজেডির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে প্রাণহানি ঠেকাতে এখনই বিতরণকারী ও প্রশাসনকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। অন্যথায় এর প্রবণতা ক্রমেই বাড়বে। পদদলনে ঘটবে প্রাণহানির মত ভয়াবহ ঘটনা। তিনি আরো জানান, যাকাত যেন একটা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দেয়া হয় এবং পুলিশকে অবহিত করা হয়। তাছাড়া এটা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যিনি যাকাত দিচ্ছেন। তাহলে বিশৃঙ্খল হবার ব্যাপারটা কম থাকবে। যাকাত পেতে গিয়ে যেন সহায়তা প্রার্থীরা ধাক্কাধাক্কি না করে এবং মানবিক দিক থেকে তাদের অপমান করা না হয়। তাই যারা যাকাত পাবেন তাদের মানবিক দিকটা খেয়াল রেখে যাকাত দিতে হবে। এছাড়া সরকারের যাকাত বোর্ডের মাধ্যমেও যাকাত দিতে পারেন। তাহলে এসব অঘটন থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে বলে জানান মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক।

এদিকে আজ সোমবার বিকেলে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ সদর দফতরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) সোহেলী ফেরদৌস ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, রমজান মাসে যারা যাকাত-সদকা ও ইফতার সামগ্রী দেবেন, তারা যাতে যাকাত গ্রহীতাদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখেন। লোক সমাগমস্থলে সব সময় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সুযোগ থাকে। আর যাকাত দেয়ার সময় অবশ্যই উচিত পুলিশকে জানানো ও পুলিশের সহায়তা গ্রহন করা। তাহলে যে কোন ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে যাকাত প্রদানকারীকে অবশ্যই পুলিশকে জানাতে হবে এবং প্রয়োজনে অনুমতি নিয়ে পুলিশের সহায়তা নিতে হবে। এ জন্য সারাদেশে পুলিশ সবসময় প্রস্তুত রয়েছে।

অপরদিকে যারা যাকাত-সদকা ও ইফতার সামগ্রী গ্রহনে ইচ্ছুক, তারা যাতে লোক সমাগমস্থল ভালো করে পর্যবেক্ষণ করেন। এবং নিজেদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে উন্মুক্তস্থানে শৃঙ্খলভাবে এসব যাকাত-সদকা ও ইফতার সামগ্রী গ্রহন করার জন্য হতদরিদ্র দুস্থদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সহেলী ফেরদৌস।

ঢাকা প্রতিদিন ডটকম/২১ মে/এসকে

Loading...

Check Also

রাত ১০টার পর ফেসবুক বন্ধের দাবি বিরোধীদলীয় নেত্রীর

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক, ঢাকা প্রতিদিন.কম ২২ সেপ্টেম্বর : ছেলেমেয়েদের ভালোর জন্য এবং ‘বিপথ’ থেকে রক্ষার জন্য ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *