Home / আন্তর্জাতিক / সিরীয়দের ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে?

সিরীয়দের ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে?

ডেস্ক রিপোর্ট : যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা সিরিয়ার সরকারি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দেশটির কয়েক বছরের গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতায় দিন কাটানো সিরীয় জনগণের জীবনে তেমন কোনও পরিবর্তন আসেনি। রাজধানী দামেস্কে কয়েক হাজার মানুষ প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পক্ষে রাজপথে নেমেছেন। দেশটিতে আসাদকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো এখনও কেউ নেই। সম্প্রতি ইসলামিক স্টেট (আইএস)-র দখলমুক্ত করা রাক্কাতে জিহাদিদের পুঁতে রাখা মাইন ধ্বংস করা হয়েছে। আর যে দৌমাতে রাসায়নিক হামলার কারণে পশ্চিমারা হামলা চালিয়েছে সেই শহরের মানুষেরা ছুটেছেন আশ্রয়ের খোঁজে। অনেক আগে থেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালানো কয়েক লাখ সিরীয়দের সঙ্গে শামিল হয়েছেন তারা। আর যুদ্ধক্ষেত্রে কয়েক বছর ধরে চলমান সংঘর্ষে বরাবরের মতোই দেশটির বিভিন্ন গোষ্ঠী সংঘাতে লিপ্ত ছিল।

পশ্চিমা হামলা শেষ হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কার্যোদ্ধার ঘোষণার পর। রাশিয়া অভিযোগ আনছে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে আর সিরিয়াকে এই অবস্থা থেকে উত্তরণে স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় কাজে ফিরছেন প্রেসিডেন্ট আসাদ।
অন্তত পক্ষে আগামী কয়েকদিন সিরীয় জনগণের অবস্থা থাকবে কষ্টের ও যন্ত্রণাময়। স্থানীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাতের কবলে থাকা সিরীয় জনগণ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির লড়াইয়ে চিড়েচ্যাপ্টা হচ্ছেন। জাতিসংঘ আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনায় আসবে না শান্তি, নিরাপত্তা পরিষদ এখনও এই রক্তাক্ত সংঘাত বন্ধে বিভক্ত।

সাত বছরে অনেকেই এই যুদ্ধ বন্ধের একমাত্র বাস্তবধর্মী সমাধান হিসেবে ইরান ও রাশিয়ার সহযোগিতা পুষ্ট আসাদকে ক্ষমতায় রাখার কথা বলবেন। হয়ত তাকে কার্যকরভাবে নির্বাচিত হতেও দেবেন। আসাদের ক্ষমতায় থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সমাধানে আগানো যাবে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কুর্দিদের সঙ্গে তুরস্কের লড়াই, ইরান ও ইসরায়েলের ছায়াযুদ্ধ এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া সমাজের পুনর্গঠন করা যাতে শরণার্থীরা ফিরে আসতে পারে।

আসাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর খারাপ সম্পর্ক বিরাজ করছে। এসব দেশের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, যুদ্ধের সময় নৃশংসতার জন্য আসাদকে শাস্তি দেওয়া উচিত। আসাদ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দেশটির পুনর্গঠনে তারা কোনও ভূমিকা রাখবে না বলে বদ্ধ পরিকর।

পশ্চিমাদের এই অবস্থানের বিরোধীদের দাবি, তারা যদি সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না করে আসাদকে শাস্তি দেওয়ার জন্য তাহলে তিনি সাধারণ সিরীয়দের জীবন আরও বিভীষিকাময় করে তুলতে পারেন।

ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক জশুয়া ল্যান্ডিস বলেন, আপনারা আসাদকে শাস্তি দিচ্ছেন না, আপনার সিরিয়ার দরিদ্র জনগণকে শাস্তি দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য যদি হয় সন্ত্রাসবাদ দমন তাহলে স্থিতিশীলতা ও শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনার মতো সবগুলো বিষয় ব্যর্থ হবে।

গত শুক্রবারের হামলাটি আসাদকে উৎখাতের জন্য চালানো হয়নি। আসাদকে সহযোগিতাকারী ইরান ও রাশিয়ার সেনাদের উপর চালানো হয়নি, সহিংসতা থেকে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষার জন্যও এই হামলা চালায়নি পশ্চিমারা। কার্যত, এই হামলা চালানো হয়েছে পরিকল্পিতভাবে যাতে করে যুক্তরাষ্ট্র আরও গভীর সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে এবং সংঘাতের নানামূখী পক্ষকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

দৌমার একজন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মী ওসামা শোঘারি বলেন, আমেরিকার হামলায় সিরীয়দের কিছুই বদলাবে না। বাস্তবে তারা কিছুই বদলাতে পারেনি। সিরিয়ায় আরও বড় ধরনের অভিযান না চালাতে পশ্চিমাদের যে অবস্থান তা রাশিয়া ও ইরানের জন্য সুসংবাদ। আর রোববার বেশ খুশি ছিলেন আসাদ। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা রুশ রাজনীতিকদের একটি দল এই কথা জানিয়েছে। রুশ প্রতিনিধি দলের এক সদস্য নাতালিয়া কামারোভা দেশটির এক সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট আসাদের একটি ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে, তিনি খুশি। তবে প্রতিনিধি দলের আরেক সদস্য জানিয়েছেন, সিরিয়াকে পুনর্গঠনের জন্য আসাদের প্রয়োজন ৪০০ বিলিয়ন ডলার।

পশ্চিমা হামলার প্রথম বার্তা যদি আসাদ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবেন না তাহলে একই সঙ্গে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, যাই করুন না কেন তাকে ক্ষমতায় রাখা হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সিরিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক স্যাম হেলার বলেন, যদি ধরে নেওয়া হয় রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে তবু আসাদের অস্ত্রাগারে অনেক কিছুই রয়েছে যা দিয়ে সিরীয় জনগণকে হত্যা করা হয়েছে। আসাদের তা অব্যাহত রাখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

সাত বছরের দীর্ঘ সংঘাতে সিরিয়াকে টুকরো টুকরো করেছে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো। তুরস্ককে নিয়ে উত্তরে, পূর্বে কুর্দি নেতৃত্বাধীন মিলিশিয়াদের নিয়ে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইরান আসাদকে বিদ্রোহীদের অবস্থানগুলো উৎখাতে সহযোগিতা করছে। এই পরিস্থিতিতে সিরিয়ার বিবাদমান গোষ্ঠীগুলোর শান্তি স্থাপনের জন্য কারও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেই। যে পরিকল্পনার আওতায় দেশটির কয়েক লাখ শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনা হবে ও পুনরায় দেশটি গড়ে তোলা সম্ভব হবে। অনেকেই মনে করেন, এই প্রক্রিয়ায় আসাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন না। বৈরুতের কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক মাহা ইয়াহিয়া বলেন, আমার মনে হয় এটা খুব অদূরদর্শী ও ভ্রান্ত ধারণা। আসাদকে জয়ী করে ক্ষমতায় রাখার অর্থ হলো সিরিয়া এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার কেন্দ্রেই থাকবে। এই প্রতিষ্ঠানের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, আসাদ যদি ক্ষমতায় থাকেন তাহলে তিনি প্রতিবেশী দেশ ও ইউরোপ থেকে শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনার কাজে উৎসাহী হবেন না। মাহা ইয়াহিয়া বলেন, আসাদ যতোদিন ক্ষমতায় রয়েছেন ততদিন তারা ফিরছেন না। কারণ আসাদ ক্ষমতায় থাকলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা আসবে বলে বিশ্বাস নেই তাদের।

এই গবেষকের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র সমাধান হলো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াসহ তুরস্ক ও ইরানের মতো দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা। এতেই সিরিয়ায় শান্তি আসতে পারে। কিন্তু এই লক্ষ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য ব্যাপক কূটনীতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রহ নেই। গত শুক্রবারের হামলার পর ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হতাশাবাদী নীতির কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের রক্ত বা অর্থ মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। এটা একটি সমস্যাপূর্ণ অঞ্চল। আমরা সেটাকে ভালো করার চেষ্টা করতে পারি কিন্তু তা সমস্যাগ্রস্ত। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মিসর ও কাতারের মতো দেশগুলো এক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সৌদি ও আমিরাত ইয়েমেনে যুদ্ধে লিপ্ত। এছাড়া প্রথম তিনটি দেশ কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে সিরিয়া ইস্যুতে কিভাবে চারটি দেশ একত্রিত হয়ে কাজ করবে তা অস্পষ্ট।

সিরিয়ায় হামলার পূর্বে ট্রাম্প সিরিয়ার জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলার সহযোগিতা আটকে দেন। তিনি জানান, অচিরেই পূর্ব সিরিয়া থেকে ২ হাজার মার্কিন সেনাকে ফিরিয়ে আনতে চান। সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্স নামে পরিচিত কুর্দি মিলিশিয়াদের নিয়ে আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র রাক্কার মতো শহর পুনর্গঠনের কাজে সহযোগিতা করছে। এই শহরটি কিছুদিন আগেই জিহাদিমুক্ত করা হয়েছে। শহরগুলো পুনর্গঠন এবং অন্য দেশে পালিয়ে সিরীয় শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনার আগেই সিরিয়ার সড়কগুলোকে মাইন ও বিস্ফোরক মুক্ত করতে হবে। পরাজয়ের আগে জিহাদিরা এসব পুঁতে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা পাওয়া রাক্কা সিভিল কাউন্সিলের মুস্তাফা আল-আবেদ বলেন, সব জায়গায় মাইন রয়েছে। বাড়িতে, গাড়িতে, রাস্তায়। কোনও জায়গা বাকি নেই। সব স্থানেই রয়েছে।

আবেদ বলেন, সিরীয় সরকার সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করছে আমাদের বিরুদ্ধে। তাই পশ্চিমা হামলা আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত ছিল যাতে সরকারের পতন হয়। এই সিরীয় জানান, মার্কিন সেনাদের উপস্থিতির কারণে রাক্কায় আসছে না সিরীয়, রুশ ও ইরানি সেনারা। তিনি আশঙ্কা করেন, মার্কিন সেনারা চলে গেলে এটা ঘটবে। বলেন, আবার এখানে লড়াই শুরু হবে, যেমনটা ছিল আগে। আমরা ফিরে যাব লড়াই, আতঙ্ক আর হত্যাকা-ে।

ঢাকা প্রতিদিন ডটকম/১৭ এপ্রিল/এসকে

Loading...

Check Also

ইরানে হামলার মাস্টার প্ল্যান যুক্তরাষ্ট্রের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকা প্রতিদিন.কম ২৪ সেপ্টেম্বর : ইরানে সামরিক কুচকাওয়াজে হামলা চালিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ‘যুক্তরাষ্ট্রের ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *